ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষ ভর্তি নিয়ে প্রতি বছরই উত্তেজনা থাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক (আন্ডারগ্র্যাজুয়েট) প্রোগ্রামে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে ভর্তি সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে এই নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে। যারা এই প্রতিবেদনটি পড়ছেন, তারা যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান, তাহলে এই ৪টি নির্দেশনা খুব মনযোগ দিয়ে পড়ুন। কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে আপনার ভর্তির পুরো রূপরেখা।
ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হলো অনলাইনে ভর্তি ফি জমা দেওয়া। অনেক শিক্ষার্থী ভেবে বসেন, শুধু ফলাফল পাওয়ার পরেই হল দেখতে যেতে হবে। কিন্তু না, আধুনিক এই যুগে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ১০ মার্চ থেকে অনলাইনে ভর্তি ফি প্রদান ও প্রাথমিক ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে।
এই দিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আপনি যদি এই সময়ের মধ্যে ফি জমা না দেন, তাহলে পরবর্তী ধাপে যেতে পারবেন না। মনে রাখবেন, এটি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা। তাই ১০ মার্চের আগেই আপনার প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র, ছবি এবং অন্যান্য তথ্য তৈরি করে রাখুন। অনলাইনে ফি জমা দেওয়ার সময় নেটওয়ার্কের সমস্যা হতে পারে, তাই একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করাই ভালো।
অনলাইন ফি জমা দেওয়ার শেষ তারিখ
আগের ধাপে আমরা জানলাম কখন শুরু হচ্ছে। কিন্তু শেষ তারিখ না জানলে সেই কাজটি সময়মতো শেষ করা সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে দ্বিতীয় নির্দেশনায় উল্লেখ করেছে, অনলাইনে ভর্তি ফি প্রদানের শেষ তারিখ হচ্ছে ২৮ মার্চ।
আপনার কাছে মোট ১৮ দিনের মতো সময় থাকবে ফি জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে শুধু ফি জমা দিলেই হবে না, তা সঠিকভাবে জমা হয়েছে কিনা, সেই রশিদ (রিসিট) প্রিন্ট করা আছে কিনা, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। অনলাইনে ফি জমা দেওয়ার সময় বিভিন্ন গেটওয়ের মাধ্যমে টাকা কাটা যায়। টাকা কাটার পর যদি কোনো কারণে তা ভর্তি পোর্টালে আপডেট না হয়, তাহলে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের হেল্পডেস্কে যোগাযোগ করুন। সময় শেষ হয়ে গেলে আর কোনো অভিযোগ গ্রহণ করা নাও হতে পারে।
অনলাইনে ফি জমা দেওয়ার পরেই কিন্তু ভর্তি সম্পন্ন হয় না। এটি শুধু প্রাথমিক ধাপ। তৃতীয় নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অনলাইনে ভর্তি ফি প্রদান সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের বরাদ্দপ্রাপ্ত বিষয় অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা ইনস্টিটিউট এবং নির্ধারিত হলে উপস্থিত হয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
অর্থাৎ, আপনি যে বিষয়ে (যেমন: বাংলা, রসায়ন, অর্থনীতি) ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, সেই বিভাগের অফিসে গিয়ে আপনার কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি, আপনি যদি আবাসিক হলে থাকতে চান, তাহলে নির্ধারিত হলের অফিসেও গিয়ে ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, কারণ এখানে আপনার আসল সার্টিফিকেট, মার্কশিট এবং অন্যান্য প্রমাণপত্র যাচাই করা হবে। কোনো কাগজপত্রে গরমিল পাওয়া গেলে আপনার ভর্তি বাতিলও হতে পারে। তাই সব কাগজপত্র আগে থেকেই ভালো করে সাজিয়ে রাখুন।
বিভাগ ও হলে ভর্তির নির্ধারিত সময়সীমা
সরাসরি উপস্থিত হয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চতুর্থ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরাসরি উপস্থিত হয়ে বিভাগ বা ইনস্টিটিউট ও হলে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করার নির্ধারিত তারিখ হচ্ছে ৬ এপ্রিল হতে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত।
মাত্র ৪ দিনের মধ্যে আপনাকে আপনার বিভাগ এবং হলে (যদি প্রযোজ্য হয়) ভর্তি হয়ে যেতে হবে। এই সময়সীমা খুবই সংক্ষিপ্ত। তাই ৬ এপ্রিলের আগেই আপনার বিভাগ এবং হলে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্রের ফটোকপি, পাসপোর্ট সাইজের ছবি, এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করে রাখুন। একই সঙ্গে, আপনি যেখানে ভর্তি হবেন, সেই বিভাগ এবং হলের অবস্থান সম্পর্কেও আগে থেকে ধারণা রাখুন, যাতে সময়মতো পৌঁছাতে পারেন।
শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীরাই নয়, যারা জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুবিধা নিতে চান, তাদের জন্যও আলাদা নির্দেশনা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভর্তি আবেদন সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় সুবিধায় ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এটি একটি আলাদা প্রক্রিয়া। আপনি যদি ক্রীড়া কোটায় ভর্তি হতে চান, তাহলে শুধু সাধারণ ভর্তির ফি জমা দিলেই হবে না। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের নোটিশ সেকশনের ‘খেলোয়াড়’ মেনুতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি দেখে আলাদাভাবে আবেদন করতে হবে। সেখানে কী কী কাগজপত্র লাগবে, কীভাবে আবেদন করতে হবে, তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। এই সুযোগটি পেতে চাইলে দেরি না করে দ্রুত সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে নিন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করুন।
ভর্তি নিয়ে কিছু অতিরিক্ত সতর্কতা
উপরের ৪টি নির্দেশনার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং নিয়ম কঠোর। তাই এসব দিকে নজর রাখুন:
১. সময়সূচি মানা: প্রতিটি ধাপের শুরু এবং শেষের তারিখ মেনে চলা জরুরি। নির্ধারিত সময়ের একদিন পরেও যদি আপনি ফি জমা দেন বা বিভাগে যান, তাহলে আপনার ভর্তি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ রাখে না।
২. কাগজপত্রের যথার্থতা: অনলাইন ফি জমা দেওয়ার সময় আপনি কিছু তথ্য দিয়ে থাকবেন। সেই তথ্যের সাথে আপনার আসল সার্টিফিকেটের তথ্যের মিল থাকা চাই। নামের বানান, পিতার নাম, জন্মতারিখ—সবকিছু একই থাকতে হবে। সামান্য ভুলেও জটিলতা হতে পারে।
৩. ওয়েবসাইট নিয়মিত চেক করা: বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করুন। কোনো পরিবর্তন, জরুরি নোটিশ বা নতুন কোনো নির্দেশনা দিলে সেটি সবার আগে সেখানে প্রকাশ পায়। শুধু এই প্রতিবেদনের উপর ভরসা না করে নিজেও সক্রিয় থাকুন।
৪. হল ভর্তি সংক্রান্ত জটিলতা: অনেক সময় দেখা যায়, বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলেও হলের আসন নিয়ে সমস্যা হয়। আবাসিক হলগুলোতে আসন সীমিত। তাই দ্রুততম সময়ে বিভাগে ভর্তি হয়ে হল অফিসে যোগাযোগ করুন। দেরি করলে আসন না-ও পেতে পারেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ�ু সাধারণত যোগ্য শিক্ষার্থীদের জন্য হলের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করে।
৫. জালিয়াতি থেকে সতর্ক: ভর্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায়। কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে বিভাগ বদলে দেওয়া, ভর্তি করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি নামে প্রতারণা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতে হয়। তাই এই ধরনের প্রলোভনে কখনো পা দেবেন না। কোনো সমস্যা হলেই সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি অফিসে যোগাযোগ করুন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষ ভর্তি নিয়ে এই ৪টি নির্দেশনা শুধু একটি তালিকা মাত্র নয়। এটি আসলে পুরো ভর্তি প্রক্রিয়ার রোডম্যাপ। এই নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করলেই আপনি ধাপে ধাপে সঠিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবেন।
অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় পাস করার পর স্বস্তিতে পড়ে যান এবং সময়মতো ফি জমা দিতে ভুলে যান। আবার কেউ কেউ বিভাগে ভর্তির সময় বিভ্রান্তিতে পড়ে যান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যে তারিখগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করা আবশ্যক।
এছাড়াও, ভর্তি সংক্রান্ত এই নির্দেশনায় অনলাইন এবং অফলাইন উভয় প্রক্রিয়ার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। প্রথমে অনলাইনে ফি জমা, তারপর সরাসরি বিভাগ ও হলে উপস্থিত হওয়া—এই দ্বৈত প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করলেই আপনার ভর্তি চূড়ান্ত হবে।
ভর্তি পরবর্তী করণীয়
আপনি যদি উপরের সবগুলো ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলেন, তাহলে অভিনন্দন। আপনি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু ভর্তি হয়ে গেলেই সব শেষ নয়। এরপর শুরু হয় নতুন এক জীবন।
ভর্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ক্লাস কবে শুরু হবে, ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম কখন হবে, সেসব তথ্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট এবং আপনার বিভাগের নোটিশ বোর্ডে জানিয়ে দেওয়া হবে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য সাধারণত আলাদা ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। সেখানে অংশগ্রহণ করা জরুরি, কারণ সেখানেই আপনি আপনার বিভাগের শিক্ষক, সিনিয়র শিক্ষার্থীদের সাথে পরিচিত হতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নিয়মকানুন সম্পর্কে জানতে পারবেন।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম বর্ষ ভর্তি নিয়ে আশা করি উপরের আলোচনা থেকে আপনি পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন। ১০ মার্চ থেকে অনলাইনে ফি জমা শুরু, শেষ ২৮ মার্চ। এরপর ৬ এপ্রিল থেকে ৯ এপ্রিলের মধ্যে সরাসরি বিভাগ ও হলে উপস্থিত হয়ে ভর্তি সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা আবেদন প্রক্রিয়া চলছে।
শেষ মুহূর্তে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি এড়াতে সবসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিবিষয়ক অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের ওপর নজর রাখুন। আপনার স্বপ্নের এই বিশ্ববিদ্যালয়টি অর্জন করতে সামান্য সতর্কতা আর সময়ানুবর্তিতা আপনার কাজকে অনেক সহজ করে দেবে। সবাইকে শুভেচ্ছা।
আরও পড়ুনঃএইচএসসি পরীক্ষা ২০২৬ ঢাকা বোর্ডে বাতিল কেন্দ্রগুলোর তালিকা ও নতুন নির্দেশনা










