পরিবেশ দূষণ রচনা 20 পয়েন্ট – একটি বিস্তারিত আলোচনা

ভূমিকা

মানুষ এবং প্রকৃতির মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য পরিবেশের ভূমিকা অপরিসীম। পরিবেশ হলো প্রাণের ধারক ও বাহক। মানুষ, প্রাণী এবং উদ্ভিদ সবাই তাদের নিজ নিজ পরিবেশ থেকে বেঁচে থাকার উপাদান সংগ্রহ করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে আমাদের চারপাশের এই সুন্দর পরিবেশ তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারাচ্ছে। পরিবেশ যখন তার স্বাভাবিক গুণাগুণ হারিয়ে জীবজগতের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে আমরা পরিবেশ দূষণ বলি। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে মানুষই এই দূষণের প্রধান কারণ, আবার মানুষই পারে সচেতনতার মাধ্যমে এই পৃথিবীকে বাঁচাতে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা পরিবেশ দূষণ (Environment Pollution) এর কারণ, প্রভাব এবং প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

পরিবেশ ও পরিবেশ দূষণ কী

আমাদের চারপাশের সবকিছু যেমন গাছপালা, মাটি, পানি, বায়ু, ঘরবাড়ি, দালানকোঠা এবং আলো-বাতাস নিয়েই গড়ে ওঠে আমাদের পরিবেশ। পরিবেশ মূলত দুই ধরণের হয়ে থাকে: প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং কৃত্রিম বা মানবসৃষ্ট পরিবেশ। প্রকৃতিদত্ত উপাদান নিয়ে গঠিত হয় প্রাকৃতিক পরিবেশ, আর মানুষের তৈরি উপাদান নিয়ে গঠিত হয় কৃত্রিম পরিবেশ।

যখন কোনো কারণে পরিবেশের এই উপাদানগুলোর ভৌত, রাসায়নিক বা জৈবিক বৈশিষ্ট্যের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটে এবং তা জীবজগতের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে পরিবেশ দূষণ বলা হয়। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জীবনকে সহজ ও আরামদায়ক করেছে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে। মানুষ নিজের স্বার্থে প্রকৃতিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে, যার ফলে পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। Peter Williston-এর মতে, “Environment pollution is a great threat to existence of living being on the earth.”

পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণসমূহ

পরিবেশ দূষণ হঠাৎ করে ঘটে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত কারণ। স্থান ও কালভেদে দূষণের কারণ ভিন্ন হতে পারে, তবে সাধারণ কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি: বাড়তি মানুষের জন্য বাড়তি বাসস্থান ও খাদ্যের প্রয়োজনে বন জঙ্গল কেটে ফেলা হচ্ছে।

  • শিল্পায়ন: কলকারখানার বর্জ্য এবং কালো ধোঁয়া পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে।

  • যানবাহনের কালো ধোঁয়া: ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসকে বিষাক্ত করে তুলছে।

  • রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার: কৃষিকাজে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটি ও পানি নষ্ট করছে।

  • অসচেতনতা: যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিক ফেলা।

  • গ্রিনহাউজ ইফেক্ট (Greenhouse Effect): বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে।


খাদ্য দূষণ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বেঁচে থাকার জন্য মানুষের খাদ্যের প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমানে বিশুদ্ধ খাবার পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মেশাচ্ছে এবং পচন রোধ করতে ফরমালিন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করছে। শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ফলমূল—সবকিছুতেই রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে মানুষ ক্যানসার, কিডনি রোগ এবং লিভারের জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা এই দূষণের শিকার হচ্ছে বেশি।

তেজস্ক্রিয় দূষণ ও আধুনিক সভ্যতা

বর্তমান বিশ্বে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য উন্নত দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা করছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে যে তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গত হয়, তা পরিবেশের জন্য ভয়ানক। এটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে এবং এর প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে।

পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ ফলাফল

পরিবেশ দূষণের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর ফলে আমরা নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি:

১. জলবায়ু পরিবর্তন: পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২. দুর্যোগ বৃদ্ধি: বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বেড়ে গেছে।

৩. জীববৈচিত্র্য ধ্বংস: অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

৪. রোগবালাই বৃদ্ধি: নতুন নতুন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। World Health Organization-এর মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশু মৃত্যুর একটি বড় কারণ হলো দূষিত পানি এবং বায়ু।

পরিবেশ রক্ষায় বনায়ন ও আমাদের করণীয়

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বনায়ন বা গাছ লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে প্রকৃতি রুষ্ট হচ্ছে। পরিবেশ দূষণ রোধে আমাদের যা করতে হবে:

  • বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং বনভূমি সংরক্ষণ করতে হবে।

  • প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমিয়ে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

  • কলকারখানার বর্জ্য শোধন করে নদীতে ফেলতে হবে (ETP ব্যবহার নিশ্চিত করা)।

  • কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • ময়লা-আবর্জনা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে এবং রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।

উপসংহার

পরিবেশ দূষণ রোধ করা কেবল সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে যে, সুস্থ পরিবেশ ছাড়া সুস্থ জীবন অসম্ভব। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ হিসেবে এখানে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া অসম্ভব হবে।

Almond and Colednan যথার্থই বলেছেন- “The contamination of the atmosphere has victimized normal existence must be eradicated for our betterment.” আসুন, আমরা সবাই মিলে পরিবেশ দূষণ রোধে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই এবং একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলি।

আরও পড়ুনঃ স্বদেশপ্রেম রচনা ২০ পয়েন্ট

Bikrom Das

আমি বিক্রম দাস একজন প্রফেশনাল রাইটার। আমি প্রযুক্তি, মোবাইল, ইনকাম তথ্য সম্পর্কিত লেখালেখি করে থাকি। আশাকরি আমার লেখা ভ্যালুয়েবল আর্টিকেল পড়ে আপনারা উপকৃত হচ্ছেন।

Leave a Comment