আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেন। সেই পরীক্ষার এক ভয়ংকর রূপ ছিল নবী ইউনুস (আ.)-এর ওপর। মাছের পেটের নিকষ কালো অন্ধকারেও তিনি তাঁর পালনকর্তাকে ভোলেননি। আর সেই কঠিন মুহূর্তেই তিনি যে দোয়াটি পাঠ করেছিলেন, তাই আজ দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত। এটি শুধু একটি দোয়া নয়, বরং মুমিনের জন্য বিপদমুক্তির এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
দোয়া ইউনুস আরবি, উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ
এই দোয়াটি পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে। চলুন, দোয়াটির সঠিক আরবি, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থ জেনে নেই।
দোয়া ইউনুস আরবি:
لَا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
দোয়া ইউনুস বাংলা উচ্চারণ:
‘লা ইলাহা ইল্লা আংতা, সুবহানাকা ইন্নি কুংতু মিনাজ জ্বালিমিন।’
দোয়া ইউনুস বাংলা অর্থ:
“তুমি ব্যতীত সত্য কোনো উপাস্য নেই; তুমি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের (অত্যাচারীদের) দলভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।”

দোয়া ইউনুসের ফজিলত ও হাদিসের বর্ণনা
এই দোয়ার ফজিলত অপরিসীম। হজরত ইউনুস (আ.)-এর মতো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি যখন আন্তরিকভাবে এই দোয়া পড়েন, তখন আল্লাহ তাআলা তার ডাকে সাড়া দেন।
নবী করীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, মাছের পেটে থাকা অবস্থায় হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়াটি ছিল এই ‘লা ইলাহা ইল্লা আংতা…’। যে কোনো মুসলমান যদি কোনো প্রয়োজনে এই দোয়া পড়ে আল্লাহকে ডাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেবেন। (তিরমিজি, মুসনাদে আহমদ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, আমার ভাই ইউনুসের দোয়াটি অত্যন্ত সুন্দর। এর প্রথম অংশে রয়েছে কালিমা তাইয়্যেবা, মাঝের অংশে তাসবিহ এবং শেষের অংশে নিজের অপরাধের স্বীকারোক্তি। যে কোনো চিন্তিত, দুঃখিত বা বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি যদি প্রতিদিন এই দোয়াটি তিনবার পাঠ করে, তাহলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেবেন। (কানজুল উম্মাল)
দোয়া ইউনুস কতবার পড়লে খতম হয়
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই দোয়াটি কখন পড়তে হবে? কতবার পড়তে হবে? বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী এর কয়েকটি পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলো:
প্রথম পদ্ধতি: কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিদিন ফজর ও এশার নামাজের পর ১১ বার করে দোয়া ইউনুস পাঠ করে এবং thereafter মোনাজাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, ইনশাআল্লাহ তা কবুল হয়। এই আমলটি একটানা ৪১ দিন করতে হবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি: অনেক বুজুর্গ ব্যক্তি সিজদার মধ্যে ৪০ বার এই দোয়া পড়ে দোয়া করাকে দ্রুত কবুল হওয়ার মাধ্যম বলে উল্লেখ করেছেন।
তৃতীয় পদ্ধতি: বর্ণিত আছে, দৈনিক এক হাজার বার দোয়াটি পড়লে আল্লাহ তাআলা বান্দার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন, রিজিকে বরকত দেন, দুশ্চিন্তা ও কষ্ট দূর করেন এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করেন।
দোয়া ইউনুস খতমের নিয়ম ও দলিল
দোয়া ইউনুস মূলত কোরআনে বর্ণিত একটি দোয়া। এটি একটি বড় তাসবিহ বা জিকির হিসেবেও পরিচিত। এটি পাঠের জন্য নির্দিষ্ট কোনো খতমের দলিল বা সনদের প্রয়োজন হয় না। আপনি যেকোনো সময়, যেকোনো বিপদে বা মানসিক অশান্তিতে এই দোয়াটি পড়তে পারেন। নিয়মিত পড়ার জন্য উপরের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। হাদিসে এই দোয়াটিকে বিপদ থেকে মুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে।
প্রশ্ন: দোয়া ইউনুস কি শুধু বিপদে পড়তে হয়?
উত্তর: না, এটি যেকোনো সময় পড়া যায়। তবে বিপদ-আপদ, দুশ্চিন্তা এবং মনোকষ্ট দূর করার জন্য এটি বিশেষভাবে কার্যকর।
প্রশ্ন: দোয়া ইউনুস কি নামাজের পর পড়া যাবে?
উত্তর: অবশ্যই। ফরজ নামাজের পর এটি পড়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। বিশেষ করে ফজর ও এশার পর ১১ বার পড়ার কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
প্রশ্ন: এই দোয়া কি আরবিতে না পড়লে হবে না?
উত্তর: দোয়াটি আরবিতে পড়াই উত্তম। তবে অর্থ না বোঝা পর্যন্ত বাংলা উচ্চারণ দেখে পড়া যেতে পারে, কিন্তু অর্থ জানা ও বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
দোয়া ইউনুস আমাদের শেখায়, বিপদ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যায় না। মাছের পেটের অন্ধকারেও আল্লাহকে ডাকার মতো সাহস জোগায় এই দোয়া। তাই আসুন, আমরা নিয়মিত এই দোয়ার আমল করি এবং আমাদের জীবনকে সুন্দর ও বিপদমুক্ত করার চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই দোয়ার ফজিলত লাভের তৌফিক দান করুন।
আরও পড়ুনঃ এশার নামাজের নিয়ত আরবি এবং বাংলা সহ



