দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আশার আলো দেখা দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া চাকরিজীবীদের জন্য জাতীয় বেতন কমিশন এক যুগান্তকারী সুপারিশ পেশ করেছে। এবারের সুপারিশে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জাতীয় বেতন কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই প্রতিবেদনে শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আজকের আর্টিকেলে আমরা সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো, প্রস্তাবিত গ্রেড ভিত্তিক বেতনের পরিমাণ এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি যদি সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী হন, তবে এই তথ্যগুলো আপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় বেতন কমিশনের নতুন সুপারিশ ও মূল পরিবর্তনসমূহ
সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে এই সুপারিশমালা তৈরি করেছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই প্রতিবেদন হস্তান্তরের সময় কমিশনের সদস্যরা জানান, এবারের কাঠামোটি অত্যন্ত সৃজনশীল এবং জনবান্ধব।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের মতোই ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। তবে টাকার অঙ্কে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। এতদিন সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ছিল ১:৯.৪, যা কমিয়ে ১:৮ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিচের দিকের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রধান উপদেষ্টা এই প্রতিবেদন গ্রহণ করে একে একটি “মস্ত বড় কাজ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, মানুষ বহুদিন ধরে এই সুসংবাদের অপেক্ষায় ছিল। তবে এটি বাস্তবায়নে সরকারের রাজকোষে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে, যা সামলানো একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
প্রস্তাবিত গ্রেড অনুযায়ী নতুন বেতনের তালিকা
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন বাড়ছে। কমিশন সূত্রে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর একটি স্বচ্ছ ধারণা নিচে তুলে ধরা হলো। এখানে ১ থেকে ২০ গ্রেড পর্যন্ত প্রস্তাবিত মূল বেতনের একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো।
গ্রেড ১ থেকে ১০ পর্যন্ত প্রস্তাবিত পরিবর্তন
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে সর্বোচ্চ ধাপে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
| গ্রেড (Grade) | বর্তমান মূল বেতন (টাকা) | প্রস্তাবিত মূল বেতন (টাকা) | মন্তব্য |
| ১ম গ্রেড | ৭৮,০০০ | ১,৬০,০০০ | সর্বোচ্চ ধাপ |
| ২য় গ্রেড | ৬৬,০০০ | ১,৩২,০০০ | দ্বিগুণ বৃদ্ধি |
| ৩য় গ্রেড | ৫৫,৫০০ | ১,১৩,০০০ | – |
| ৪র্থ গ্রেড | ৫০,০০০ | ১,০০,০০০ | – |
| ৫ম গ্রেড | ৪৩,০০০ | ৮৬,০০০ | – |
| ৬ষ্ঠ গ্রেড | ৩৫,৫০০ | ৭১,০০০ | – |
| ৭ম গ্রেড | ২৯,০০০ | ৫৮,০০০ | – |
| ৮ম গ্রেড | ২৩,০০০ | ৪৭,২০০ | – |
| ৯ম গ্রেড | ২২,০০০ | ৪৫,১০০ | এন্ট্রি লেভেল (অফিসার) |
| ১০ম গ্রেড | ১৬,০০০ | ৩২,০০০ | – |
এই তালিকা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
আরও পড়ুনঃ পত্রিকায় লেখালেখি করে আয় করার উপায় ২০২৬
গ্রেড ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত প্রস্তাবিত পরিবর্তন
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য এই পে-স্কেলটি অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করার প্রস্তাবটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
- ১১তম গ্রেড: ১২,৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫,০০০ টাকা।
- ১২তম গ্রেড: ১১,৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৪,৩০০ টাকা।
- ১৩তম গ্রেড: ১১,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৪,০০০ টাকা।
- ১৪তম গ্রেড: ১০,২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩,৫০০ টাকা।
- ১৫তম গ্রেড: ৯,৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২,৮০০ টাকা।
- ১৬তম গ্রেড: ৯,৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ২১,৯০০ টাকা।
- ১৭তম গ্রেড: ৯,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ২১,১০০ টাকা।
- ১৮তম গ্রেড: ৮,৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ২১,০০০ টাকা।
- ১৯তম গ্রেড: ৮,৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,৫০০ টাকা।
- ২০তম গ্রেড: ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা (সর্বনিম্ন ধাপ)।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর এই ধাপে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবায়ন করতে সরকারের কত টাকা ব্যয় হবে?
বেতন বৃদ্ধির এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য মোটেও সহজ হবে না। কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানিয়েছেন, এই সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন। তাদের বেতন ও ভাতার জন্য সরকারের বর্তমান ব্যয় হয় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে এই ব্যয়ের পরিমাণ দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে যাবে। তবে সরকার আশা করছে, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অপচয় রোধ করার মাধ্যমে এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করা সম্ভব হবে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই প্রতিবেদনটি এখন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর এটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে এবং চূড়ান্তভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা কমিশন
বেসামরিক কর্মচারীদের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ জমা দেওয়া হলেও, সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সদস্যদের জন্য প্রক্রিয়াটি কিছুটা ভিন্ন। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বেসামরিক সরকারি চাকরিজীবীদের প্রতিবেদন জমার পর এখন সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করা হবে।
এছাড়া, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এবং জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য প্রচলিত ২০টি ধাপের বাইরে একটি বিশেষ ধাপ বা ‘সুপার গ্রেড’ তৈরি করার পরিকল্পনা করছে অর্থ বিভাগ। এটি পরবর্তী সময়ে আলাদা প্রজ্ঞাপন বা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। তাই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখতে আমাদের আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
নতুন পে-স্কেল ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে পুরোনো স্কেলে সংসার চালানো অনেকের জন্যই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির এই সুপারিশ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এই নতুন কাঠামোর কিছু বিশেষ সুবিধা:
- আর্থিক স্বচ্ছলতা: বেতন বাড়লে কর্মচারীদের দুর্নীতি করার প্রবণতা কমবে বলে আশা করা যায়।
- জীবনযাত্রার মান: নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা তাদের পরিবার নিয়ে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবেন।
- পেনশন সুবিধা: মূল বেতন বাড়ার সাথে সাথে পেনশনভোগীদের সুবিধাও আনুপাতিক হারে বাড়বে।
- সামাজিক মর্যাদা: একটি সম্মানজনক বেতন কাঠামো সরকারি চাকরির প্রতি মেধাবীদের আরও আকৃষ্ট করবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বেতন বাড়ার সাথে সাথে বাজার মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। অন্যথায়, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুফল সাধারণ মানুষ বা খোদ চাকরিজীবীরাও পুরোপুরি ভোগ করতে পারবেন না। বেতন বাড়ার খবরে যেন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জিনিসের দাম বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে সরকারকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
আরও পড়ুনঃ গল্প লিখে টাকা আয় করার উপায় ২০২৬
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে?
উত্তর: কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। এখন এটি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিসভায় পর্যালোচনা করা হবে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হলে এটি কার্যকর হবে। সম্ভবত আগামী অর্থবছরের শুরু থেকে এটি বাস্তবায়িত হতে পারে।
২. সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন কত সুপারিশ করা হয়েছে?
উত্তর: জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১,৬০,০০০ টাকা করার সুপারিশ করেছে।
৩. ২০টি গ্রেডের বাইরে কি কোনো বিশেষ গ্রেড থাকছে?
উত্তর: হ্যাঁ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য ২০টি গ্রেডের বাইরে একটি স্বতন্ত্র ধাপ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৪. এই বেতন কাঠামো কি পেনশনভোগীদের জন্যও প্রযোজ্য হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, মূল বেতন বৃদ্ধির ফলে পেনশনভোগীদের আনুষঙ্গিক সুবিধাও নিয়ম অনুযায়ী বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন।
৫. সামরিক ও বিচার বিভাগের বেতন কি এই কাঠামোর আওতায় বাড়বে?
উত্তর: না, তাদের জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠন করা হবে এবং তাদের সুপারিশ অনুযায়ী পৃথকভাবে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো দেশের লক্ষ লক্ষ পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর একটি প্রয়াস। যদিও ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত বাজেট সংস্থান করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবুও জনস্বার্থে এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা আনতে এটি সময়ের দাবি।
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে এই সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু বেতন বৃদ্ধিই শেষ কথা নয়, এর পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণ রাখাটাও সমান জরুরি। আমরা আশা করি, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবে।

1 thought on “সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো,গ্রেড অনুযায়ী কার কত বেতন বাড়ছে?”