ইউটিউব শর্টস এআই অবয়ব: নিজের এআই দিয়ে ভিডিও তৈরির ফিচার

বর্তমান সময়ে ভিডিও কন্টেন্ট বা ছোট আকারের ভিডিও তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ইউটিউব শর্টস (YouTube Shorts) অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দ্রুত বিনোদন এবং তথ্য শেয়ার করার মাধ্যম হিসেবে এটি দর্শকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু অনেক কন্টেন্ট ক্রিয়েটর আছেন যারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন বা সময়ের অভাবে নিয়মিত ভিডিও তৈরি করতে পারেন না। তাদের জন্য সুখবর নিয়ে এল ইউটিউব।

এখন থেকে নিজের ডিজিটাল প্রতিরূপ বা ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করা যাবে। ইউটিউব ঘোষণা করেছে যে, তারা শীঘ্রই এমন একটি ফিচার চালু করতে যাচ্ছে যেখানে নির্মাতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজেদের হুবহু অবয়ব তৈরি করতে পারবেন। এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব এই নতুন প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করবে, এর সুবিধাগুলো কী এবং এটি কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আনবে।

ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব বিষয়টি আসলে কী?

সহজ কথায়, এআই অবয়ব হলো আপনার একটি ডিজিটাল সংস্করণ। ইউটিউবের নতুন এই ফিচারের মাধ্যমে আপনি আপনার চেহারা এবং কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত চরিত্র তৈরি করতে পারবেন। পরবর্তীতে, আপনি যখন কোনো ভিডিও তৈরি করতে চাইবেন, তখন সরাসরি ক্যামেরার সামনে না দাঁড়িয়েও কেবল লিখিত প্রম্পট বা নির্দেশনার মাধ্যমে ওই এআই অবয়ব দিয়ে ভিডিও তৈরি করিয়ে নিতে পারবেন।

এটি মূলত ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব প্রযুক্তির একটি জাদুকরী ব্যবহার, যা ভিডিও তৈরির সময় ও শ্রম উভয়ই বাঁচাবে। ইউটিউব কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রযুক্তিটি মানুষের বিকল্প নয়, বরং সৃজনশীলতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

নতুন এআই ফিচারের সুবিধা ও ব্যবহার

ইউটিউবের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) নীল মোহন জানিয়েছেন, চলতি বছর থেকেই নির্মাতারা এই সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। এই ফিচারের প্রধান লক্ষ্য হলো শর্টসের বিপুল দর্শকসংখ্যা ধরে রাখা এবং নির্মাতাদের কাজকে সহজ করা। নিচে এর কিছু প্রধান সুবিধা আলোচনা করা হলো:

১. সময় সাশ্রয় ও ধারাবাহিকতা

একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের জন্য প্রতিদিন সেজেগুজে ক্যামেরার সামনে বসা বেশ সময়সাপেক্ষ। এআই অবয়ব থাকলে আপনি যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে স্ক্রিপ্ট লিখে দিলেই আপনার ডিজিটাল রূপ ভিডিও তৈরি করে দেবে। এতে চ্যানেলে ভিডিও আপলোডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।

২. গেম ও মিউজিক তৈরিকারীদের জন্য সুবিধা

শুধু অবয়ব তৈরিই নয়, নীল মোহন জানিয়েছেন যে লিখিত প্রম্পট ব্যবহার করে গেম তৈরি এবং নতুন মিউজিক নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ, ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব এর পাশাপাশি গেমিং এবং মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতেও এটি বড় প্রভাব ফেলবে।

৩. সৃজনশীলতার বিকাশ

অনেক প্রতিভাবান মানুষ আছেন যারা ভালো স্ক্রিপ্ট লিখতে পারেন কিন্তু অভিনয়ে পারদর্শী নন। এই প্রযুক্তির ফলে তাদের সৃজনশীলতা প্রকাশের পথ আরও প্রশস্ত হবে।

আরও পড়ুনঃ ২০২৬ সালে মোবাইল দিয়ে ভালো ছবি তোলার নিয়ম

ইউটিউব শর্টসে এআই টুলের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

ইউটিউব শর্টসকে জনপ্রিয় করতে গুগল প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করছে। বর্তমানেও শর্টসে বেশ কিছু এআই টুল কার্যকর রয়েছে। নতুন এআই অবয়ব ফিচারটি বর্তমান টুলগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে ভিডিও তৈরির অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

বর্তমানে চালু থাকা কিছু এআই সুবিধা:

  • অটোমেটেড ভিডিও ক্লিপ: এআই ব্যবহার করে বড় ভিডিও থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছোট ক্লিপ বা শর্টস তৈরি করা।

  • এআই স্টিকার: ভিডিওর বিষয়বস্তু অনুযায়ী কাস্টমাইজড স্টিকার ব্যবহার।

  • স্বয়ংক্রিয় ডাবিং: এক ভাষার ভিডিও অন্য ভাষায় ডাবিং করার সুবিধা।

এই সবকিছুর সাথে যখন ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব যুক্ত হবে, তখন একটি ভিডিও তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটি হাতের মুঠোয় চলে আসবে। এটি নির্মাতাদের জন্য একটি “ওয়ান-স্টপ সলিউশন” হিসেবে কাজ করবে।

এক নজরে সাধারণ ভিডিও বনাম এআই ভিডিও

নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে সাধারণ ভিডিও এবং এআই অবয়ব দিয়ে তৈরি ভিডিওর পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

বৈশিষ্ট্যসাধারণ ভিডিও মেকিংএআই অবয়ব দিয়ে ভিডিও মেকিং
সময়শুটিং ও এডিটিংয়ে প্রচুর সময় লাগেখুব কম সময়ে প্রম্পট দিয়ে তৈরি করা যায়
খরচলাইট, ক্যামেরা ও সেটআপের খরচ আছেতেমন কোনো বাহ্যিক খরচের প্রয়োজন নেই
উপস্থাপনাসরাসরি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে হয়ক্যামেরার সামনে না আসলেও চলে
ধারাবাহিকতাঅসুস্থতা বা ব্যস্ততায় ভিডিও দেওয়া কঠিনযেকোনো পরিস্থিতিতে ভিডিও তৈরি সম্ভব
কাস্টমাইজেশনপুনরায় শুট করতে হয়কমান্ড দিয়ে সহজেই পরিবর্তন করা যায়

এআই অবয়বের অপব্যবহার রোধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

প্রযুক্তির যেমন সুবিধা আছে, তেমনি এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও থাকে। বিশেষ করে “ডিপফেক” (Deepfake) প্রযুক্তির যুগে অন্যের চেহারা বা কণ্ঠ ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও তৈরির বিষয়টি বেশ উদ্বেগের। তবে ইউটিউব এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে।

১. অবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তি

গত বছরের অক্টোবর মাসে ইউটিউব একটি বিশেষ প্রযুক্তি চালু করেছে যা এআই দিয়ে তৈরি মুখ বা কণ্ঠ শনাক্ত করতে পারে। যদি কেউ অনুমতি ছাড়া কোনো নির্মাতার চেহারা বা কণ্ঠ ব্যবহার করে ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব তৈরি করে, তবে আসল মালিক বা নির্মাতা সেই ভিডিও অপসারণের জন্য ইউটিউবকে অনুরোধ (Request removal) জানাতে পারবেন।

২. নির্মাতাদের নিয়ন্ত্রণ

নতুন এই উদ্যোগের আওতায়, একজন নির্মাতা তার নিজের এআই অবয়ব কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এআই কন্টেন্ট তৈরির জন্য একটি আলাদা ব্যবস্থাপনা বা ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে, যা নির্মাতাদের তাদের ডিজিটাল স্বত্ব রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

৩. ট্রান্সপারেন্সি বা স্বচ্ছতা

ইউটিউব জানিয়েছে, এআই দিয়ে তৈরি যেকোনো কন্টেন্টে অবশ্যই লেবেল বা ট্যাগ থাকতে হবে, যাতে দর্শকরা বুঝতে পারেন যে এটি একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও। এটি বিভ্রান্তি এড়াতে সাহায্য করবে।

ইউটিউব শর্টস থেকে আয়ের নতুন সম্ভাবনা

ইউটিউব শর্টস বর্তমানে আয়ের একটি অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন এআই ফিচারগুলো ব্যবহার করে নির্মাতারা এখন আরও বেশি ভিডিও তৈরি করতে পারবেন, যা তাদের আয় বাড়াতে সাহায্য করবে।

  • বেশি ভিউ, বেশি আয়: এআই ব্যবহার করে দ্রুত ভিডিও তৈরি করার ফলে চ্যানেলে কন্টেন্টের সংখ্যা বাড়বে, যা সাবস্ক্রাইবার এবং ভিউ বাড়াতে সহায়তা করবে।

  • গ্লোবাল রিচ: এআই ডাবিং এবং এআই অবয়ব ব্যবহার করে আপনি সহজেই বিভিন্ন ভাষার দর্শকদের জন্য ভিডিও তৈরি করতে পারবেন। এতে আপনার ভিডিওর দর্শক শুধু একটি দেশে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের জগতও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউটিউব শর্টসে এআই অবয়ব যুক্ত হওয়া সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় অংশ। এটি নতুন এবং পুরনো উভয় ধরনের নির্মাতাদের জন্যই একটি দুর্দান্ত সুযোগ। একদিকে যেমন এটি ভিডিও তৈরির কষ্ট কমাবে, অন্যদিকে সৃজনশীলতার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।

তবে মনে রাখতে হবে, এআই শুধুই একটি টুল বা সহায়ক মাত্র। দর্শকদের মন জয় করতে হলে আপনার কন্টেন্টের মান, গল্প এবং উপস্থাপনার স্বকীয়তা বজায় রাখা জরুরি। আপনি কি আপনার নিজের এআই অবয়ব তৈরি করতে প্রস্তুত? কমেন্ট করে আমাদের জানান!

প্রযুক্তি এবং ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কিত আরও নতুন নতুন আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।

ইসাবেলা ক্লার্ক একজন কনটেন্ট রাইটার ও ব্লগার, বর্তমানে বার্মিংহামে বসবাস করছেন। তিনি শিক্ষা, তথ্যভিত্তিক ও ডিজিটাল বিষয় নিয়ে সহজ, পরিষ্কার ও পাঠকবান্ধব লেখা তৈরি করেন। জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা এবং পাঠকের কাজে লাগে এমন মানসম্মত কনটেন্ট দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Comment