জমি কেনা অনেক মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। সঠিকভাবে যাচাই না করলে এই বিনিয়োগ বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। জমি কেনার আগে কি কি দেখতে হয় এই প্রশ্নটি নতুন ও অভিজ্ঞ উভয় ক্রেতার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় ভুল দলিল, দখল সমস্যা, উত্তরাধিকার জটিলতা বা ব্যাংক বন্ধকের কারণে মানুষ বড় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাই জমি কেনার আগে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা খুবই জরুরি।
জমি কেনার আগে কি কি দেখতে হয়
জমি কেনার আগে প্রথম কাজ হলো জমির মালিকানার কাগজপত্র যাচাই করা। বিক্রেতার কাছ থেকে জমির দলিল, খতিয়ান, পর্চা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্রের ফটোকপি সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট তহশিল অফিস, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রার অফিস এবং এসিল্যান্ড অফিসে গিয়ে এই কাগজপত্র যাচাই করা উচিত।
দলিলের মাধ্যমে জানা যায় জমির মালিক কে, কত শতাংশ জমি বিক্রি করা হচ্ছে এবং জমির কোনো মামলা বা বিরোধ আছে কিনা। খতিয়ান ও পর্চা থেকে জমির খাজনা অবস্থা এবং মালিকানা ইতিহাস জানা যায়। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
অনুমতিপত্র ও কর্তৃপক্ষ যাচাই
জমি যদি রাজউক বা অন্য কোনো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় থাকে, তাহলে বিক্রির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র প্রয়োজন হয়। বিক্রেতার কাছে এই অনুমতিপত্র আছে কিনা তা যাচাই করা জরুরি।
অনেক সময় জমি গণপূর্ত বিভাগ, হাউজিং সোসাইটি বা ব্যক্তিমালিকানায় থাকতে পারে। জমি কোন কর্তৃপক্ষের অধীনে রয়েছে তা নিশ্চিত করা দরকার। ব্যক্তিমালিকানার জমির ক্ষেত্রে সাধারণত আলাদা অনুমতিপত্রের প্রয়োজন হয় না, তবে দলিল ও মালিকানা সঠিকভাবে যাচাই করা আবশ্যক।
সরেজমিনে জমির অবস্থা যাচাই
কাগজপত্র ঠিক থাকলেও সরেজমিনে জমির অবস্থা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাগজে উল্লেখিত জমির পরিমাণ বাস্তবে ঠিক আছে কিনা, জমির সীমানা নির্ধারণ সঠিক কিনা এবং সরকার কোনো অংশ অধিগ্রহণ করেছে কিনা তা দেখতে হবে।
স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বললে জমি নিয়ে কোনো সমস্যা, বিরোধ বা মামলা আছে কিনা জানা যায়। অভিজ্ঞ ভূমি পরিমাপক বা আমিন দিয়ে জমির পরিমাপ করালে ভবিষ্যতে ঝামেলা এড়ানো যায়।
খাজনার কপি ও জমির দখল যাচাই
বাংলাদেশে জমির খাজনা নিয়মিত পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক। বিক্রেতার কাছ থেকে হালনাগাদ খাজনার কপি সংগ্রহ করা উচিত। খাজনা বকেয়া থাকলে ভবিষ্যতে আইনি সমস্যা হতে পারে।
জমির দখল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণ বাস্তবে দখলে পাওয়া যায় না। তাই জমি কেনার সময় বিক্রেতার কাছ থেকে বাস্তব দখল বুঝে নেওয়া জরুরি।
উত্তরাধিকার ও মর্টগেজ যাচাই
যদি বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকে, তাহলে তার নামে জমি রেজিস্ট্রেশন হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। ভাইবোন বা অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সঠিক বণ্টন হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করা জরুরি। বণ্টননামা না থাকলে ভবিষ্যতে মামলা-মোকদ্দমার ঝুঁকি থাকে।
এছাড়া জমিটি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক (mortgage) রাখা হয়েছে কিনা তা যাচাই করা দরকার। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট বা সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে এই তথ্য জানা যায়।
পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও মূল মালিক যাচাই
অনেক সময় পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমি বিক্রি করা হয়। এই ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে মূল মালিকের সাথে যোগাযোগ করা উচিত। অনেক ভুয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে জমি বিক্রি করা হয়, যা বড় ঝুঁকিপূর্ণ।
কম দামে জমি পাওয়ার লোভে পড়ে অনেকেই প্রতারণার শিকার হন। তাই জমি কেনার আগে মূল মালিকের পরিচয় নিশ্চিত করা জরুরি।
অপ্রাপ্ত বয়স্কের জমি ও সরকারি জমি যাচাই
যদি জমির মালিক অপ্রাপ্ত বয়স্ক হয়, তাহলে তার বৈধ অভিভাবকের মাধ্যমে জমি বিক্রি করা হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। আদালত কর্তৃক নিযুক্ত অভিভাবক ছাড়া জমি বিক্রি করা আইনত অবৈধ।
খাস বা সরকারি জমি কেনা-বেচা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই জমিটি সরকারি বা খাস জমি কিনা তা অবশ্যই যাচাই করতে হবে।
বায়নাপত্র ও বিক্রয় চুক্তি যাচাই
জমিটি অন্য কোনো পক্ষের সাথে বায়নাপত্র বা বিক্রয় চুক্তিতে আছে কিনা তা খোঁজ নেওয়া জরুরি। আইন অনুযায়ী, এক পক্ষের সাথে বায়নাপত্র বলবৎ থাকলে অন্য পক্ষের কাছে জমি বিক্রি করা যায় না।
সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

অভিজ্ঞ দলিল লেখকের সহযোগিতা
দলিল লেখার সময় অভিজ্ঞ দলিল লেখকের সাহায্য নেওয়া ভালো। দলিলের প্রতিটি শর্ত ভালোভাবে পড়ে নিশ্চিত হতে হবে যে তা আইন অনুযায়ী লেখা হয়েছে। ভুল দলিল ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
জমি কেনার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনুসরণ করা উচিত। প্রথমে দলিল প্রস্তুত করতে হবে এবং দলিল চূড়ান্ত হলে নামজারি বা মিউটেশনের জন্য আবেদন করতে হবে। জমির মূল্য ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করলে লেনদেনের স্বচ্ছতা থাকে। হাতে হাতে টাকা দিলে অবশ্যই সাক্ষীর উপস্থিতিতে লেনদেন করা উচিত।
জমি কেনার পর মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু কাজ করতে হয়। আমিন দিয়ে জমির সীমানা নির্ধারণ করে দখল বুঝে নিতে হবে। মূল দলিল পেতে দেরি হলে সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করা উচিত।
দলিলের নকল কপি দিয়ে ভূমি অফিসে নামজারি করতে হবে। বর্তমানে রেজিস্ট্রেশনের ৮ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয় নামজারি কার্যক্রম অনুমোদিত হয়েছে। প্রতি বছর খাজনা পরিশোধ করা এবং জমিতে চাষাবাদ বা ঘরবাড়ি নির্মাণ করলে দখল প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।
জমি কেনার আগে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
জমি কেনার আগে সব ধরনের আইনি যাচাই করা জরুরি। কোনো ধরনের তাড়াহুড়া না করে ধীরে এবং পরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। জমির দাম কম হওয়ার কারণ যাচাই করা দরকার। অনেক সময় মামলা, বিরোধ বা দখল সমস্যার কারণে জমির দাম কম থাকে।
অভিজ্ঞ আইনজীবী, দলিল লেখক এবং ভূমি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জমি কেনার আগে দলিল, খতিয়ান, অনুমতিপত্র, দখল, খাজনা, উত্তরাধিকার, মর্টগেজ এবং বায়নাপত্র যাচাই করা জরুরি। সরেজমিনে জমি পরিদর্শন, অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ এবং ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন নিরাপদ বিনিয়োগ নিশ্চিত করে। জমি কেনার পর নামজারি, খাজনা পরিশোধ এবং দখল প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ।
জমি কেনা একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। জমি কেনার আগে কি কি দেখতে হয় তা জানা থাকলে প্রতারণা, মামলা এবং আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। সঠিক যাচাই-বাছাই এবং আইনি পরামর্শ নিয়ে জমি কিনলে ভবিষ্যতে নিরাপদ এবং লাভজনক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়। তাই জমি কেনার আগে সব তথ্য যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত নিন।
আরও পড়ুনঃ অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দেশ কয়টি
