আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা ২০ পয়েন্ট

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানুন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কীভাবে বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার সম্মান বয়ে আনল, তার বিস্তারিত আলোচনা এবং তাৎপর্য আজই পড়ুন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা ২০ পয়েন্ট

ভূমিকা

বাঙালি হিসেবে আমাদের গর্বের জায়গা হলো আমাদের বাংলা ভাষা। এই ভাষা আমাদের অস্তিত্বের শিকড়, আমাদের অনুভূতির ধারক ও বাহক। পৃথিবীর খুব কম জাতিই আছে যারা নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে রক্ত দিয়েছে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার এই লড়াই কেবল একটি আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেক শহীদের তাজা রক্তে। তাঁদের সেই আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ আমরা বাংলায় কথা বলতে পারি, বাংলায় স্বপ্ন দেখতে পারি।

এই মহান ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে UNESCO ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ বা International Mother Language Day হিসেবে ঘোষণা করে। এটি এখন আর শুধু বাঙালিদের শোক বা গর্বের দিন নয়, বরং সারা বিশ্বের সকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে সম্মান জানানোর একটি বিশেষ দিন। আজকের এই আলোচনায় আমরা জানব কীভাবে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই দিনটি বিশ্বজুড়ে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হলো।

মাতৃভাষা আসলে কী

সহজ কথায় বলতে গেলে, শিশু জন্মের পর তার মায়ের কোল থেকে যে ভাষাটি প্রথম শুনতে পায় এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে যে ভাষায় সে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে শেখে, সেটিই তার মাতৃভাষা। এটি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং আবেগের মূল ভিত্তি। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসকারী মানুষেরা যে ভাষায় নিজেদের সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না প্রকাশ করতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সেটিই তাদের মাতৃভাষা।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এই ভাষায় কথা বলা আমাদের জন্য যতটা সহজ এবং সাবলীল, অন্য কোনো ভাষায় তা সম্ভব নয়। আমাদের চিন্তা-চেতনা এবং মনন বিকাশে মাতৃভাষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। কবি অতুলপ্রসাদ সেন যথার্থই লিখেছেন:

“মোদের গরব, মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা।”

এই দুটি চরণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের অকৃত্রিম ভালোবাসা।

মানবজীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব

মানুষের জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। নিজের মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে এবং নির্ভুলভাবে প্রকাশ করার জন্য মাতৃভাষার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন মাতৃভাষাতেই দেখি। যখন আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি, তখন সেই চিন্তার গঠন হয় মাতৃভাষায়। জাতীয় জীবনে এবং ব্যক্তিগত জীবনে উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে হলে মাতৃভাষার চর্চা অত্যন্ত জরুরি।

পৃথিবীতে অনেক ভাষা রয়েছে এবং প্রয়োজনে আমরা সেসব ভাষা শিখি। কিন্তু মাতৃভাষার মতো আপন এবং মধুর ভাষা আর একটিও নেই। অন্য ভাষায় জ্ঞানার্জন করা সম্ভব, কিন্তু মনের তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব নয়। এই প্রসঙ্গেই কবির সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে:

“নানান দেশের নানান ভাষা, বিনা স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা।”

অর্থাৎ, ভিনদেশি ভাষায় যতই দক্ষতা থাকুক না কেন, নিজের ভাষার মাধ্যমে যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, তা অন্য কোথাও মেলা ভার। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হলো এই মাতৃভাষা।

মাতৃভাষার মর্যাদার লড়াই

বাঙালি জাতি স্বভাবতই শান্তপ্রিয়, কিন্তু যখনই তাদের অস্তিত্বে আঘাত এসেছে, তারা বীরের মতো রুখে দাঁড়িয়েছে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালিই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। এই লড়াই প্রমাণ করে যে, বন্দুকের নল বা ক্ষমতার দাপট দিয়ে কোনো জাতির মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া যায় না।

এই সংগ্রামের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ বঞ্চনা আর শোষণের ইতিহাস। মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। রাজপথ ভিজেছে সন্তানের রক্তে। কিন্তু বাঙালি দমে যায়নি। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, প্রাণের চেয়েও প্রিয় হতে পারে মুখের ভাষা। এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি, বরং এটি বিশ্ব দরবারে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বাংলাদেশ তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। তাদের প্রথম আঘাতটি আসে আমাদের সংস্কৃতির মূল ভিত্তি—ভাষার ওপর। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও, শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এক সমাবেশে দম্ভভরে ঘোষণা করেন, “Urdu and only Urdu will be the only state language of Pakistan.” (উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা)। এই ঘোষণার পর উপস্থিত ছাত্র-জনতা তীব্র প্রতিবাদে “না, না” ধ্বনি তুলে ফেটে পড়ে। বাঙালির মনে দানা বাঁধতে থাকে ক্ষোভ। শুরু হয় মিছিল, মিটিং এবং সমাবেশ। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে রাজপথ—”রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”।

শাসকগোষ্ঠী এই আন্দোলন দমন করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালের শুরুতে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু বাঙালি তরুণরা সেই নিষেধাজ্ঞা মানতে নারাজ ছিল।

২১শে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা জড়ো হতে থাকে। লক্ষ্য একটাই— ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করা। বেলা ২টার দিকে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ অতর্কিতভাবে তাদের ওপর গুলি চালায়। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি

দীর্ঘদিন ধরে ২১শে ফেব্রুয়ারি কেবল বাংলাদেশে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হতো। কিন্তু এই মহান ত্যাগের কথা বিশ্ববাসী জানত না। বাংলা ভাষার এই লড়াইকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কানাডা প্রবাসী কয়েকজন বাঙালি। তাদের সংগঠন ‘Mother Language of the World’-এর পক্ষ থেকে রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম নামের দুই দেশপ্রেমিক বাঙালি জাতিসংঘের কাছে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব দেন।

জাতিসংঘের পরামর্শে তারা বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা তৈরি করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের পর ১৯৯৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এই প্রস্তাবটি UNESCO-র সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। এরপর শুরু হয় কূটনৈতিক তৎপরতা। অবশেষে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত UNESCO-র ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। বিশ্বের ১৮৮টি দেশ এই দিনটিকে সমর্থন জানায়।

২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে প্রথমবারের মতো সারা বিশ্বে এই দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। এটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য এক বিশাল গর্বের মুহূর্ত। আমাদের ভাষা শহীদদের রক্তদান আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

আরও পড়ুনঃ বাংলার কৃষক রচনা

স্বীকৃতির পেছনের কারিগর: প্রবাসী বাঙালিদের উদ্যোগ

এই অর্জনের পেছনে কানাডা প্রবাসী বাঙালিদের অবদান অনস্বীকার্য। ভিনদেশে থেকেও তারা দেশের প্রতি এবং মাতৃভাষার প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়। রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম যখন দেখলেন বিশ্বের অনেক ক্ষুদ্র ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা চিন্তা করলেন যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন হতে পারে ভাষা রক্ষার এক বৈশ্বিক প্রতীক।

তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সঠিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপের কারণেই আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালি থাকুক না কেন, তাদের হৃদয়ে বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা সবসময় জাগ্রত থাকে।

সিয়েরালিওনে বাংলা ভাষার সম্মান

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির পাশাপাশি বাংলা ভাষা আরেকটি বিরল সম্মান অর্জন করেছে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের দেশ সিয়েরালিওনে। সিয়েরালিওন ছিল একটি গৃহযুদ্ধ কবলিত দেশ। সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাজ শুরু করে।

বাংলাদেশি সৈন্যরা সেখানে কেবল শান্তিই ফেরাননি, বরং স্থানীয় মানুষের সাথে গড়ে তুলেছিলেন এক গভীর আত্মার সম্পর্ক। তারা সেখানে স্কুল তৈরি করেছেন, চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন এবং স্থানীয়দের বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণে মুগ্ধ হয়ে সিয়েরালিওনের সাধারণ মানুষ বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে শুরু করে।

বাংলাদেশি সেনাদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০২ সালে সিয়েরালিওন সরকার বাংলাকে তাদের দেশের অন্যতম সরকারি ভাষা (Honorary Official Language) হিসেবে ঘোষণা করে। একই সাথে তারা ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভিনদেশে বাংলা ভাষার এই জয়জয়কার আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের।

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ইতিহাসকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নির্ভুলভাবে তুলে ধরার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্থানে গুলি চলেছিল, সেখানকার স্মৃতিবিজড়িত অনেক কিছুই সংরক্ষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সময় যে আমগাছটির নিচে ছাত্ররা সমবেত হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক আমগাছটির অবশিষ্টাংশ এবং সেই সময়ের অনেক নথিপত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে।

তাছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের জন্য একটি বিশেষ গ্যালারি রয়েছে। সেখানে ভাষা শহীদদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, দুর্লভ আলোকচিত্র এবং তৎকালীন সংবাদপত্রের কাটিং সযত্নে রাখা হয়েছে। বাংলা একাডেমিও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এই সংরক্ষণগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের ভাষার অধিকার সহজে আসেনি, এর জন্য অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য

২১শে ফেব্রুয়ারি এখন আর শুধু বাঙালির শোকের দিন নয়, এটি এখন বিশ্বজুড়ে সকল ভাষাভাষী মানুষের অধিকার রক্ষার দিন। এই দিবসের মূল তাৎপর্য হলো পৃথিবীর সকল মাতৃভাষাকে সম্মান জানানো এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা।

১. ভাষার মর্যাদা রক্ষা: এই দিবসটি আমাদের শেখায় যে প্রতিটি ভাষারই সমান মর্যাদা রয়েছে। কোনো ভাষাই ছোট বা বড় নয়। ২. সংস্কৃতির বিকাশ: ভাষা হলো সংস্কৃতির বাহন। মাতৃভাষা দিবস পালনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আদান-প্রদান ঘটে। ৩. বাংলাদেশের পরিচিতি: এই দিবসের মাধ্যমে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে নতুনভাবে চিনেছে। তারা জেনেছে যে, এই বদ্বীপের মানুষ ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে। এটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। ৪. ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা রক্ষা: পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা আজ বিলুপ্তির পথে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই বিপন্ন ভাষাগুলোকে রক্ষা করার জন্য জনসচেতনতা তৈরি করে।

একুশের দীক্ষা

২১শে ফেব্রুয়ারি বা একুশ আমাদের কাছে কেবল একটি তারিখ নয়, এটি একটি চেতনার নাম। একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে।

একুশের দীক্ষা হলো দেশপ্রেম এবং আত্মমর্যাদাবোধ। আমরা যদি আমাদের ভাষাকে সম্মান না করি, তবে অন্য কেউ করবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে আমরা অনেকেই বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহারে উদাসীন। ইংরেজির প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক এবং বাংলার প্রতি অবহেলা ভাষা শহীদদের আত্মার প্রতি অসমমান প্রদর্শন।

আমাদের উচিত প্রমিত বাংলা ভাষার চর্চা করা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে বাংলা ভাষার সঠিক ইতিহাস জানানো। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন নিশ্চিত করা গেলেই একুশের প্রকৃত চেতনা বাস্তবায়িত হবে। যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের স্বপ্ন ছিল একটি সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠন করা। সেই লক্ষ্য পূরণে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন

প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়। ১৯৫৯ সালের পর থেকে প্রতি বছর এই দিনটি পালিত হয়ে আসছে, তবে ২০০০ সাল থেকে এটি আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে।

দিনের শুরু হয় প্রভাতফেরির মাধ্যমে। আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই খালি পায়ে হাতে ফুল নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যায় শহীদ মিনারের দিকে। সবার কণ্ঠে তখন বাজে কালজয়ী সেই গান:

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।”

এই গানের সুর ও কথা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক গভীর আবেগের সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সর্বস্তরের জনগণ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের প্রায় ১৯৩টি দেশে এই দিবসটি পালিত হয়। ইউনেস্কো সদর দপ্তরেও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতেরা শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান। এটি প্রমাণ করে যে, একুশ এখন বিশ্বজনীন।

স্মরণে ও বরণে একুশ

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে দেশজুড়ে এক অন্যরকম আবহ বিরাজ করে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। টিভি চ্যানেল এবং রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।

এই দিনে আমরা কেবল শহীদদের স্মরণই করি না, বরং নতুন করে শপথ নিই দেশকে ভালোবাসার। মসজিদ, মন্দির ও প্যাগোডায় শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশের মঙ্গল কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী একুশে বইমেলাও এই উদযাপনের এক বিশাল অংশ। বইমেলা আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রাণের মেলা, যা একুশের চেতনাকে ধারণ করে আছে।

বর্তমান প্রজন্মে একুশের প্রভাব
বর্তমান প্রজন্মে একুশের প্রভাব

বর্তমান প্রজন্মে একুশের প্রভাব

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে একুশ এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। ইন্টারনেটের যুগে তারা একুশের ইতিহাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে ২১শে ফেব্রুয়ারি নিয়ে নানা ধরনের ক্যাম্পেইন এবং কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে, যা নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের সন্ধানে সাহায্য করছে। তবে, বাংলার সাথে সাথে অন্য ভাষার মিশ্রণ বা ‘বাংলিশ’-এর ব্যবহার একটি উদ্বেগের বিষয়। একুশের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ভাষার এই দূষণ রোধ করতে হবে। তরুণদের বুঝতে হবে যে, স্মার্টনেস অন্য ভাষায় কথা বলার মধ্যে নয়, বরং নিজের ভাষায় শুদ্ধভাবে কথা বলার মধ্যেই প্রকৃত আভিজাত্য।

উপসংহার

মাতৃভূমি যদি হয় একটি বাগান, তবে মাতৃভাষা হলো সেই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর ফুল। এই ফুলের সুবাসেই একটি জাতি তার পরিচয় খুঁজে পায়। মায়ের ভাষার সাথে আমাদের সম্পর্ক রক্তের, আত্মার। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ তার মনের গহীনের কথা, প্রেম, দ্রোহ এবং প্রার্থনা প্রকাশ করে আসছে তার মাতৃভাষায়। মাতৃভাষা ছাড়া মানুষের মুক্তি নেই, বিকাশ নেই।

যারা আমাদের এই মায়ের ভাষাকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল, বাংলার দামাল ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে তাদের সেই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছে। তাদের সেই আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমরা গর্বিত জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। আমাদের দায়িত্ব হলো এই অর্জনের মর্যাদা রক্ষা করা। বাংলা ভাষাকে কেবল দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, একে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভাষা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকব এবং বিশ্বের সকল মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হব। তবেই ভাষা শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।

আরও পড়ুনঃ বাংলা রচনা

ইসাবেলা ক্লার্ক একজন কনটেন্ট রাইটার ও ব্লগার, বর্তমানে বার্মিংহামে বসবাস করছেন। তিনি শিক্ষা, তথ্যভিত্তিক ও ডিজিটাল বিষয় নিয়ে সহজ, পরিষ্কার ও পাঠকবান্ধব লেখা তৈরি করেন। জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা এবং পাঠকের কাজে লাগে এমন মানসম্মত কনটেন্ট দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।

1 thought on “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রচনা ২০ পয়েন্ট”

Leave a Comment