সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে এই প্রশ্নটি গণিতের শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণিতের সংখ্যাতত্ত্বে বিভিন্ন ধরণের সংখ্যার ধারণা রয়েছে, যার মধ্যে সহ মৌলিক সংখ্যা বা Co-prime Numbers অন্যতম। যখন দুটি সংখ্যার মধ্যে ১ ছাড়া অন্য কোনো সাধারণ গুণনীয়ক থাকে না, তখন তাদের পারস্পরিক সহ মৌলিক সংখ্যা বলা হয়। এটি কেবল মৌলিক সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং যৌগিক সংখ্যাও সহ মৌলিক হতে পারে।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব সহ মৌলিক সংখ্যা আসলে কী, এর বৈশিষ্ট্য কী এবং কীভাবে খুব সহজেই এগুলো নির্ণয় করা যায়। গণিতের ভিত্তি মজবুত করতে এই ধারণাটি পরিষ্কার থাকা আবশ্যক। নিচে সংক্ষিপ্তাকারে এই আর্টিকেলের মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলো।
সহ মৌলিক সংখ্যা হলো এমন দুটি স্বাভাবিক সংখ্যা, যাদের গসাগু (GCD) সর্বদা ১ হয়। অর্থাৎ, ১ ব্যতীত এদের অন্য কোনো সাধারণ উৎপাদক নেই। উদাহরণস্বরূপ, ৮ এবং ৯ সহ মৌলিক, যদিও তারা কেউ মৌলিক সংখ্যা নয়।
সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে?
গণিতের ভাষায়, যদি দুটি স্বাভাবিক সংখ্যার গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক বা গসাগু (HCF/GCD) ১ হয়, তবে ওই দুটি সংখ্যাকে একে অপরের সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে তার উত্তরে বলা যায় তারা পরস্পর সহ মৌলিক। ইংরেজিতে একে ‘Co-prime’ বা ‘Relatively Prime’ বা ‘Mutually Prime’ বলা হয়।
অনেক শিক্ষার্থী ভুলবশত মনে করেন যে, সহ মৌলিক হতে হলে সংখ্যা দুটিকে অবশ্যই মৌলিক সংখ্যা হতে হবে। কিন্তু এই ধারণাটি সঠিক নয়। সহ মৌলিক হওয়ার প্রধান শর্ত হলো সংখ্যা দুটির মধ্যে সাধারণ উৎপাদক হিসেবে শুধু ১ থাকবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৪ এবং ৯। এখানে ৪ একটি যৌগিক সংখ্যা এবং ৯-ও একটি যৌগিক সংখ্যা। কিন্তু ৪ এর গুণনীয়কগুলো হলো ১, ২, ৪ এবং ৯ এর গুণনীয়কগুলো হলো ১, ৩, ৯। লক্ষ্য করলে দেখবেন, উভয়ের মধ্যে সাধারণ গুণনীয়ক শুধুমাত্র ১। তাই ৪ এবং ৯ পরস্পর সহ মৌলিক সংখ্যা।
সহ মৌলিক সংখ্যার গাণিতিক ব্যাখ্যা
সহজ কথায়, দুটি সংখ্যা a এবং b পরস্পর সহ মৌলিক হবে যদি এবং কেবল যদি GCD (a, b) = 1 হয়। এটিই হলো সহ মৌলিক সংখ্যা চেনার প্রধান মানদণ্ড। এই সংজ্ঞার ওপর ভিত্তি করেই আমরা পরবর্তী ধাপে এর বৈশিষ্ট্য ও উদাহরণগুলো বিশ্লেষণ করব।
সহ মৌলিক সংখ্যার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য
আমরা আগেই জেনেছি সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে, এখন এর মূল সংজ্ঞা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানব। সহ মৌলিক সংখ্যার ধারণাটি পুরোপুরি আয়ত্ত করতে হলে এর বৈশিষ্ট্যগুলো মনে রাখা জরুরি। নিচে এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো:
- সাধারণ গুণনীয়ক ১: দুটি সংখ্যার সাধারণ গুণনীয়ক কেবলমাত্র ১ হতে হবে। ১ ছাড়া অন্য কোনো সংখ্যা দিয়ে দুটি সংখ্যাকে ভাগ করা যাবে না।
- মৌলিক হওয়ার প্রয়োজন নেই: দুটি সংখ্যাকেই মৌলিক সংখ্যা হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একটি মৌলিক এবং একটি যৌগিক, অথবা দুটিই যৌগিক সংখ্যা হতে পারে।
- পরপর দুটি সংখ্যা: যেকোনো দুটি ক্রমিক বা পরপর স্বাভাবিক সংখ্যা সর্বদা একে অপরের সহ মৌলিক হয়। যেমন: (৫, ৬), (১৪, ১৫), (৯৯, ১০০)।
- ১ এর সাথে সম্পর্ক: ১ (এক) যেকোনো স্বাভাবিক সংখ্যার সাথেই সহ মৌলিক। কারণ ১ এবং অন্য যেকোনো সংখ্যার গসাগু সর্বদা ১।
- মৌলিক সংখ্যার ধর্ম: দুটি ভিন্ন মৌলিক সংখ্যা সর্বদাই পরস্পর সহ মৌলিক হয়। যেমন: (৩, ৭), (১১, ১৩)।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো জানা থাকলে আপনি খুব সহজেই যেকোনো দুটি সংখ্যার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন তারা সহ মৌলিক কি না।
সহ মৌলিক সংখ্যার উদাহরণ ও বিশ্লেষণ
তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে তা বোঝার জন্য বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নিচে বিভিন্ন ধরণের সহ মৌলিক সংখ্যার উদাহরণ এবং কেন তারা সহ মৌলিক, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
উদাহরণ ১: দুটি মৌলিক সংখ্যা
ধরুন দুটি সংখ্যা ৫ এবং ৭।
৫ এর গুণনীয়ক: ১, ৫
৭ এর গুণনীয়ক: ১, ৭
এখানে সাধারণ গুণনীয়ক শুধুমাত্র ১। তাই (৫, ৭) হলো সহ মৌলিক জোড়।
উদাহরণ ২: একটি মৌলিক ও একটি যৌগিক সংখ্যা
ধরুন সংখ্যা দুটি হলো ৩ এবং ১০।
৩ (মৌলিক) এর গুণনীয়ক: ১, ৩
১০ (যৌগিক) এর গুণনীয়ক: ১, ২, ৫, ১০
এখানেও সাধারণ গুণনীয়ক শুধুমাত্র ১। সুতরাং, (৩, ১০) পরস্পর সহ মৌলিক।
উদাহরণ ৩: দুটি যৌগিক সংখ্যা
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো যখন দুটি যৌগিক সংখ্যা সহ মৌলিক হয়। যেমন: ৮ এবং ৯।
৮ এর গুণনীয়ক: ১, ২, ৪, ৮
৯ এর গুণনীয়ক: ১, ৩, ৯
উভয়ই যৌগিক সংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও এদের সাধারণ উৎপাদক শুধু ১। তাই (৮, ৯) একটি সহ মৌলিক জোড়।
উদাহরণ ৪: সহ মৌলিক নয় এমন সংখ্যা
এখন দেখা যাক (৬, ৮) এর ক্ষেত্রে কী ঘটে।
৬ এর গুণনীয়ক: ১, ২, ৩, ৬
৮ এর গুণনীয়ক: ১, ২, ৪, ৮
এখানে সাধারণ গুণনীয়ক ১ ছাড়াও ২ রয়েছে। যেহেতু গসাগু ১ নয়, তাই ৬ এবং ৮ সহ মৌলিক সংখ্যা নয়।
সহ মৌলিক সংখ্যা কীভাবে নির্ণয় করা যায়?
পরীক্ষার খাতায় বা গাণিতিক সমস্যায় সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে তা জানার পর সেটি নির্ণয় করার পদ্ধতি জানা আবশ্যক। সহ মৌলিক সংখ্যা নির্ণয় করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো ‘গসাগু’ বা GCD নির্ণয় পদ্ধতি। নিচে ধাপে ধাপে এটি আলোচনা করা হলো:
ধাপ ১: গুণনীয়ক বের করা
প্রথমে প্রদত্ত সংখ্যা দুটির সকল গুণনীয়ক বা উৎপাদক বের করতে হবে। ছোট সংখ্যার ক্ষেত্রে এটি মুখে মুখেই করা সম্ভব, কিন্তু বড় সংখ্যার ক্ষেত্রে ইউক্লিডীয় পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ধাপ ২: সাধারণ গুণনীয়ক চিহ্নিত করা
দুটি সংখ্যার গুণনীয়কগুলোর তালিকা থেকে সাধারণ গুণনীয়কগুলো (Common Factors) খুঁজে বের করতে হবে।
ধাপ ৩: সিদ্ধান্ত গ্রহণ
যদি দেখা যায় যে, সাধারণ গুণনীয়কগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র ১ সংখ্যাটি রয়েছে, তবে সংখ্যা দুটি নিশ্চিতভাবে সহ মৌলিক। আর যদি ১ ছাড়াও অন্য কোনো সংখ্যা (যেমন ২, ৩, ৫ ইত্যাদি) সাধারণ গুণনীয়ক হিসেবে থাকে, তবে তারা সহ মৌলিক নয়।

সংক্ষিপ্ত টিপস:
- দুটি সংখ্যা কি পরপর? তাহলে তারা সহ মৌলিক।
- দুটিই কি মৌলিক সংখ্যা? তাহলে তারা সহ মৌলিক।
- একটি কি ১? তাহলে তারা সহ মৌলিক।
- উভয় সংখ্যাই কি জোড়? তাহলে তারা সহ মৌলিক নয় (কারণ সাধারণ গুণনীয়ক ২ থাকবে)।
সহ মৌলিক সংখ্যা ও মৌলিক সংখ্যার পার্থক্য
অনেকেই সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে এবং মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে—এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেলেন। কিন্তু এদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। নিচে একটি ছকের মাধ্যমে এই পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | মৌলিক সংখ্যা (Prime Number) | সহ মৌলিক সংখ্যা (Co-prime Number) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | যে সংখ্যার ১ এবং ওই সংখ্যা ছাড়া অন্য কোনো গুণনীয়ক নেই। | দুটি সংখ্যার গসাগু ১ হলে তারা পরস্পর সহ মৌলিক। |
| সংখ্যার পরিমাণ | এটি একটি একক সংখ্যার বৈশিষ্ট্য। | এটি সর্বদা দুটি সংখ্যার মধ্যকার সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য। |
| উদাহরণ | ২, ৩, ৫, ৭, ১১ ইত্যাদি। | (৩, ৪), (৫, ৭), (৮, ৯) ইত্যাদি। |
| শর্ত | সংখ্যাটিকে অবশ্যই ১ এর চেয়ে বড় হতে হবে। | সংখ্যাগুলো মৌলিক বা যৌগিক যেকোনোটি হতে পারে। |
| সম্পর্ক | অন্য সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। | একটি সংখ্যা অন্য সংখ্যার সাপেক্ষে সহ মৌলিক হয়। |
এই ছক থেকে এটি পরিষ্কার যে, মৌলিক সংখ্যা হলো একটি সংখ্যার নিজস্ব ধর্ম, আর সহ মৌলিক সংখ্যা হলো দুটি সংখ্যার পারস্পরিক সম্পর্ক।
গণিতে সহ মৌলিক সংখ্যার গুরুত্ব
গণিতের বিভিন্ন শাখায় সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে এর জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে পাটিগণিত এবং সংখ্যাতত্ত্বে এর ব্যবহার ব্যাপক। নিচে এর কিছু গুরুত্ব আলোচনা করা হলো:
প্রথমত, লসাগু (LCM) নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সহ মৌলিক সংখ্যার ভূমিকা অনন্য। আমরা জানি, দুটি সংখ্যার গুণফল = সংখ্যাদ্বয়ের লসাগু × সংখ্যাদ্বয়ের গসাগু। যেহেতু সহ মৌলিক সংখ্যার গসাগু ১, তাই এদের লসাগু হলো সংখ্যা দুটির সরাসরি গুণফল। যেমন, ৫ এবং ৬ সহ মৌলিক, তাই এদের লসাগু ৩০ (৫×৬)।
দ্বিতীয়ত, ক্রিপ্টোগ্রাফি বা তথ্য প্রযুক্তির নিরাপত্তায় সহ মৌলিক সংখ্যার ব্যবহার অপরিহার্য। বিশেষ করে RSA অ্যালগরিদমে বড় দুটি মৌলিক সংখ্যা এবং তাদের সহ মৌলিক সম্পর্ক ব্যবহার করে ডেটা এনক্রিপশন করা হয়।
তৃতীয়ত, ভগ্নাংশ লঘুকরণ বা কাটাকাটি করার সময় আমরা লব ও হরের গসাগু দিয়ে ভাগ করি। যখন লব ও হর পরস্পর সহ মৌলিক হয়ে যায়, তখন আর কাটাকাটি করা যায় না। অর্থাৎ, একটি ভগ্নাংশ তার লঘিষ্ঠ আকারে তখনই থাকে যখন লব ও হর পরস্পর সহ মৌলিক হয়।
পরীক্ষায় সহ মৌলিক সংখ্যা সম্পর্কিত প্রশ্ন
ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে টপিকটি থেকে পরীক্ষায় প্রায়ই বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন আসে। এখানে কিছু নমুনা প্রশ্ন ও তাদের ধরণ আলোচনা করা হলো যা প্রস্তুতিতে সহায়ক হবে:
- সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন: (৮, ১৫) সংখ্যাজোড়টি কি সহ মৌলিক? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর: হ্যাঁ, কারণ ৮ এর গুণনীয়ক (১, ২, ৪, ৮) এবং ১৫ এর গুণনীয়ক (১, ৩, ৫, ১৫)। সাধারণ গুণনীয়ক কেবল ১। - নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন (MCQ): নিচের কোন জোড়টি সহ মৌলিক নয়?
ক) (৫, ৭) খ) (১০, ২১) গ) (১২, ১৮) ঘ) (১৩, ১৪)।
উত্তর: গ) (১২, ১৮)। কারণ এদের গসাগু ৬, যা ১ এর চেয়ে বড়। - প্রমাণমূলক প্রশ্ন: দেখাও যে, পরপর দুটি স্বাভাবিক সংখ্যা সর্বদা সহ মৌলিক।
সমাধান: এটি প্রমাণ করতে ইউক্লিডীয় অ্যালগরিদম বা গাণিতিক যুক্তি ব্যবহার করতে হয়।
এই ধরণের প্রশ্নগুলো অনুশীলন করলে সহ মৌলিক সংখ্যার ধারণা আরও স্বচ্ছ হবে এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সহজ হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সহ মৌলিক সংখ্যা কাকে বলে তা জানা কেবল পরীক্ষার জন্য নয়, বরং গণিতের গভীরতা বোঝার জন্যও জরুরি। আমরা জানলাম যে, সহ মৌলিক হতে হলে সংখ্যাগুলোকে মৌলিক হতে হয় না, বরং তাদের গসাগু ১ হলেই চলে। (৮, ৯) বা (১৪, ১৫) এর মতো যৌগিক সংখ্যার জোড়ও যে সহ মৌলিক হতে পারে, তা এই ধারণাকে আরও চমকপ্রদ করে তোলে।
আপনার গণিত শেখার যাত্রায় এই গাইডটি সহায়ক হবে বলে আশা করি। সহ মৌলিক সংখ্যার বৈশিষ্ট্য, নির্ণয় পদ্ধতি এবং পার্থক্যগুলো মনে রাখলে সংখ্যাতত্ত্বের অনেক জটিল সমস্যা সমাধান করা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে। নিয়মিত অনুশীলন করুন এবং গণিতের ভুবনে নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলুন।
