পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম জানা থাকলে জরুরি মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবীর সংক্রমণে হতে পারে। যদিও সব ধরণের ডায়রিয়ায় এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না, তবুও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে সঠিক ওষুধ গ্রহণ করা জরুরি। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা পাতলা পায়খানার সেরা কিছু ওষুধের নাম, সেবনবিধি এবং সতর্কতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
সারসংক্ষেপ: বেশিরভাগ পাতলা পায়খানা ভাইরাল কারণে হয় এবং আপনা-আপনি সেরে যায়। তবে মলের সাথে রক্ত বা তীব্র জ্বর থাকলে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হতে পারে। তখন ডাক্তারের পরামর্শে সিপ্রোফ্লক্সাসিন বা এজিথ্রোমাইসিন জাতীয় এন্টিবায়োটিক সেবন করা যেতে পারে। ডিহাইড্রেশন রোধে স্যালাইন খাওয়া সবচেয়ে জরুরি।
পাতলা পায়খানা কাকে বলে?
সাধারণত দিনে তিন বা তার বেশিবার পানির মতো তরল পায়খানা হলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা বলা হয়। এটি কোনো রোগ নয় বরং শরীরের ভেতরের কোনো সংক্রমণের লক্ষণ। দূষিত পানি, পঁচা বা বাসি খাবার এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে আমাদের অন্ত্রে ক্ষতিকারক জীবাণু প্রবেশ করলে শরীর তা বের করে দেয়ার জন্য অন্ত্রের গতি বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। একেই আমরা সাধারণ ভাষায় পাতলা পায়খানা বলি। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে এটি ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার কারণ হতে পারে যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
পাতলা পায়খানায় কখন এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়?
অনেকেই মনে করেন, পাতলা পায়খানা শুরু হলেই বুঝি এন্টিবায়োটিক খেতে হবে। এটি একটি ভুল ধারণা। বেশিরভাগ ডায়রিয়া রোটাভাইরাস বা অন্যান্য ভাইরাসের কারণে হয়, যা এন্টিবায়োটিক দ্বারা নিরাময়যোগ্য নয়। ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া সাধারণত ৩-৫ দিনের মধ্যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মাধ্যমেই সেরে যায়।
তবে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এন্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে:
- পায়খানার সাথে রক্ত বা আম গেলে (ডিসেন্ট্রি)।
- তীব্র জ্বর বা পেটে অসহনীয় ব্যথা থাকলে।
- মল পরীক্ষার পর যদি ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া (যেমন: ই. কোলাই, সালমোনেলা) বা পরজীবী (যেমন: জিয়ার্ডিয়া) পাওয়া যায়।
- ভ্রমণজনিত ডায়রিয়া বা ট্রাভেলার্স ডায়রিয়া হলে।
পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম ও তালিকা
ব্যাকটেরিয়াজনিত ডায়রিয়ার চিকিৎসায় চিকিৎসকরা সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন। নিচে বাংলাদেশের বাজারে বহুল প্রচলিত পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম এবং তাদের জেনেরিক নাম উল্লেখ করা হলো:
| জেনেরিক নাম (Generic Name) | জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাম (Brand Names) | ব্যবহারের ক্ষেত্র |
|---|---|---|
| Ciprofloxacin (সিপ্রোফ্লক্সাসিন) | Ciprocin, Neofloxin, Cipro | প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যাকটেরিয়াল ডায়রিয়ায় বহুল ব্যবহৃত। |
| Azithromycin (এজিথ্রোমাইসিন) | Zithrox, Odnyl, Azithrocin | কলেরা বা ট্রাভেলার্স ডায়রিয়ায় কার্যকর। |
| Metronidazole (মেট্রোনিডাজল) | Amodis, Filmet, Metro | আমাশয় বা পরজীবীজনিত সংক্রমণে ব্যবহৃত। |
| Erythromycin (এরিথ্রোমাইসিন) | Eromycin, Erythro | বিশেষ কিছু ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে বিকল্প হিসেবে। |
১. সিপ্রোফ্লক্সাসিন (Ciprofloxacin)
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম বলতে গেলে সিপ্রোফ্লক্সাসিন সবার আগে আসে। এটি দিনে দুইবার (সকালে ও রাতে) সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিন সেবন করতে হয়। তবে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে এটি এড়িয়ে চলা উচিত।
২. এজিথ্রোমাইসিন (Azithromycin)
যাদের সিপ্রোফ্লক্সাসিনে সমস্যা আছে বা গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা অনেক সময় এজিথ্রোমাইসিন সাজেস্ট করেন। এটি দিনে একবার নির্দিষ্ট ডোজ অনুযায়ী খেতে হয়।
৩. মেট্রোনিডাজল (Metronidazole)
যদি পাতলা পায়খানার সাথে আম বা রক্ত যায়, তবে এটি অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি হতে পারে। এক্ষেত্রে মেট্রোনিডাজল অত্যন্ত কার্যকর। এটি দিনে তিনবার ৫ থেকে ৭ দিন খেতে হতে পারে।
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এন্টিবায়োটিক খাওয়ার ঝুঁকি
আমাদের দেশে ফার্মেসিতে গিয়ে সহজেই ওষুধ কেনা যায় বলে অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই এন্টিবায়োটিক সেবন শুরু করেন। এটি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক খেলে শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায়, যা পরবর্তীতে হজমশক্তির সমস্যা তৈরি করে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স’। আপনি যদি সঠিক নিয়মে বা পূর্ণ মেয়াদে ওষুধ না খান, তবে পরবর্তীতে ওই এন্টিবায়োটিক আর আপনার শরীরে কাজ করবে না। তাই পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম জানলেও, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া তা সেবন করা থেকে বিরত থাকুন।
পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম জানার পাশাপাশি ORS এর গুরুত্ব
পাতলা পায়খানার চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিকের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো রিহাইড্রেশন বা শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করা। প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর স্যালাইন (ORS) খাওয়া আবশ্যক। এন্টিবায়োটিক জীবাণু মারে, কিন্তু শরীরের দুর্বলতা কাটাতে পারে না।
- খাওয়ার স্যালাইন: প্রতিবার পায়খানার পর আধা লিটার পানিতে এক প্যাকেট স্যালাইন মিশিয়ে পান করুন।
- জিংক ট্যাবলেট: বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়ার সময় ১০-১৪ দিন জিংক ট্যাবলেট খাওয়ানো হলে অন্ত্রের ক্ষত দ্রুত সারে এবং পুনরায় ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকি কমে।
- তরল খাবার: ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, ডাবের পানি এবং সুপ বেশি করে খেতে হবে।
শিশুদের পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম ও সতর্কতা
শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার নিয়ম প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিশুদের পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম ও ডোজ তাদের ওজন এবং বয়সের ওপর নির্ভর করে। শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণত রোটাভাইরাস দিয়ে হয়, তাই এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন খুব কম হয়।
শিশুদের জন্য সিপ্রোফ্লক্সাসিন এড়িয়ে চলা হয় কারণ এটি হাড়ের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর পরিবর্তে সেফিক্সিম (Cefixime) বা এজিথ্রোমাইসিন সিরাপ চিকিৎসকের পরামর্শে দেওয়া হতে পারে। কখনোই বাচ্চার জন্য নিজে থেকে ফার্মেসি থেকে ট্যাবলেট কিনে খাওয়াবেন না, এতে কিডনি বিকল হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
পাতলা পায়খানা হলে কোন ওষুধ এড়ানো উচিত?
অনেকে দ্রুত পায়খানা বন্ধ করার জন্য লোপেরামাইড (Loperamide) জাতীয় ওষুধ (যেমন: Imodium) সেবন করেন। এটি অন্ত্রের গতি কমিয়ে দেয়, ফলে পায়খানা আটকে যায়। কিন্তু যদি অন্ত্রে বিষাক্ত জীবাণু থাকে, তবে এই ওষুধ সেই জীবাণুকে শরীরের ভেতরেই আটকে রাখে, যা ইনফেকশনকে আরও গভীর করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডায়রিয়া হলো শরীরের একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যার মাধ্যমে শরীর বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়। তাই জোর করে পায়খানা বন্ধ করার ওষুধ না খাওয়াই ভালো, বিশেষ করে যদি জ্বর বা রক্ত থাকে।
পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম জানা থাকলেও কখন ডাক্তার দেখাবেন?
যদিও আপনি পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম জেনে গেছেন, তবুও নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে হাসপাতালে যাওয়া উচিত:
- যদি ২৪ ঘন্টার মধ্যে পায়খানা না কমে বরং বাড়ে।
- প্রচণ্ড পেটে ব্যথা বা মলের সাথে তাজা রক্ত গেলে।
- চোখ গর্তে ঢুকে গেলে, জিভ শুকিয়ে গেলে বা চামড়া ঢিলা হয়ে গেলে (মারাত্মক পানিশূন্যতা)।
- রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে যায় বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়।
- ১০২ ডিগ্রির বেশি জ্বর থাকলে।
লেখকের শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম ও তালিকা সম্পর্কে ধারণা রাখা ভালো, তবে তার যথেচ্ছ ব্যবহার কাম্য নয়। ডায়রিয়া হলে প্রথম কাজ হলো শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা। বিশুদ্ধ পানি, খাবার স্যালাইন এবং পুষ্টিকর তরল খাবারই ডায়রিয়া মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার। এন্টিবায়োটিক শুধুমাত্র তখনই ব্যবহার করবেন যখন চিকিৎসক তা প্রেসক্রাইব করবেন। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

1 thought on “পাতলা পায়খানার এন্টিবায়োটিক ট্যাবলেট এর নাম ও তালিকা”