শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু আমাদের আশেপাশে এমন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী আছে যাদের পড়াশোনার অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কেবল আর্থিক অনটনের কারণে তাদের স্বপ্ন পূরণে বাধা সৃষ্টি হয়। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের স্কুলের বেতন, খাতা-কলম আর প্রাইভেট টিউটরের খরচ মেটানো অনেক সময় অভিভাবকদের জন্য পাহাড়সম বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
ঠিক এই জায়গাতেই বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য আবেদন বিষয়টি একটি আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মকানুন এবং আবেদনের ধরনে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। আপনি যদি সঠিক নিয়মে এবং সুন্দর ভাষায় নিজের সমস্যার কথা প্রধান শিক্ষকের কাছে তুলে ধরতে পারেন, তবে আপনার বা আপনার সন্তানের টিউশন ফি মওকুফ হওয়া খুব কঠিন কিছু নয়।
বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন পড়ুন শিখুন
অনেকেই লজ্জার কারণে বা সঠিক তথ্যের অভাবে স্কুলের ‘Poor Fund‘ বা ‘Free Studentship‘ সুবিধাটি গ্রহণ করতে চান না। কিন্তু মনে রাখবেন, এটি কোনো দয়া বা ভিক্ষা নয়; এটি একজন মেধাবী কিন্তু আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীর অধিকার। প্রতিটি সরকারি এবং এমপিওভুক্ত বেসরকারি বিদ্যালয়ে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের জন্য একটি নির্দিষ্ট তহবিল থাকে। এই সুযোগটি কাজে লাগালে পরিবারের ওপর থেকে যেমন বড় একটি আর্থিক চাপ কমে যায়, তেমনি শিক্ষার্থীর মনেও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
যখন একজন ছাত্র বা ছাত্রী দেখে যে তার মেধার মূল্যায়নে স্কুল তাকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে, তখন তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। তাছাড়া, স্কুলের বেতন মওকুফ হলে সেই টাকা দিয়ে অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ কেনা সম্ভব হয়। তাই লজ্জা বা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে, নিজের প্রয়োজনে এবং মেধার জোরে এই সুযোগটি গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ। তবে এই সুযোগ পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে আপনি সত্যিই এর যোগ্য এবং আপনার আর্থিক অবস্থা আসলেই নাজুক। আর এই প্রমাণের প্রথম ধাপই হলো একটি শক্তিশালী আবেদন পত্র।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি হলো বিদ্যালয় বা কলেজের প্রধানের (যেমন: প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ) নিকট লেখা একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি বা দরখাস্ত। এই চিঠির মাধ্যমে শিক্ষার্থী বিনীতভাবে তার পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কথা জানায় এবং নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বার্থে মাসিক বেতন বা টিউশন ফি মওকুফ করার অনুরোধ করে।
অনেকে মনে করতে পারেন, “মৌখিকভাবে গিয়ে স্যারের সাথে কথা বললেই তো হয়, লিখিত দরখাস্তের কী দরকার?” কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাজে লিখিত নথিপত্রের গুরুত্ব অপরিসীম। মুখের কথার কোনো দালিলিক প্রমাণ থাকে না। কিন্তু আপনি যখন একটি আবেদন পত্র জমা দেন, তখন সেটি স্কুলের অফিশিয়াল ফাইলে সংরক্ষিত থাকে। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বা শিক্ষক পরিষদ যখন মিটিংয়ে বসে সিদ্ধান্ত নেয় যে কাদের বেতন মওকুফ করা হবে, তখন তারা এই লিখিত আবেদন পত্রগুলোই যাচাই-বাছাই করে। আপনার লেখা যত গোছানো, স্পষ্ট এবং যুক্তিপূর্ণ হবে, আপনার আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকবে। এটি আপনার সততা, ভদ্রতা এবং প্রয়োজনের একটি লিখিত দলিল।
আবেদন পত্র লেখার আধুনিক নিয়ম ও কাঠামো
একটি আবেদন পত্র তখনই কর্তৃপক্ষের নজর কাড়তে সক্ষম হয়, যখন সেটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এবং মার্জিত ভাষায় লেখা হয়। এলোমেলোভাবে মনের ভাব প্রকাশ করলে তা অফিশিয়াল বা আনুষ্ঠানিক মনে হয় না। নিচে একটি আদর্শ আবেদন পত্রের প্রধান অংশগুলো এবং লেখার নিয়ম আলোচনা করা হলো:
১. কাগজের মান ও মার্জিন
সবসময় পরিষ্কার, সাদা এবং ভালো মানের এফ-ফোর (A4) সাইজের কাগজ ব্যবহার করবেন। কাগজের চারপাশ থেকে, বিশেষ করে বাম পাশে এবং ওপরে অন্তত এক ইঞ্চি পরিমাণ মার্জিন বা জায়গা ফাঁকা রাখবেন। এতে লেখাটি দেখতে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন লাগে। কোনোভাবেই ছিঁড়ে নেওয়া বা দাগযুক্ত কাগজ ব্যবহার করবেন না।
২. তারিখ ও সম্বোধন
পৃষ্ঠার ওপরের বাম দিকে স্পষ্ট করে তারিখ লিখুন। তার নিচে যাকে উদ্দেশ্য করে লিখছেন (বরাবর, প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ) তার পদবী এবং স্কুলের পূর্ণাঙ্গ নাম ও ঠিকানা লিখুন। ঠিকানা লেখার সময় জেলা বা উপজেলার নাম উল্লেখ করতে ভুলবেন না।
৩. বিষয় নির্বাচন
‘বিষয়’ অংশটি দরখাস্তের প্রাণ। এখানে খুব সংক্ষেপে মূল কথাটি লিখতে হয়। যেমন: “বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য আবেদন”। বিষয়টি দেখেই যেন প্রধান শিক্ষক বুঝতে পারেন চিঠিটি কী নিয়ে লেখা হয়েছে। বিষয়টিকে বোল্ড বা একটু গাঢ় কালিতে লিখলে ভালো হয়।
৪. সম্ভাষণ
যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে সম্ভাষণ শুরু করতে হবে। সাধারণত ‘জনাব’, ‘মহোদয়’, বা ‘শ্রদ্ধেয় স্যার’ দিয়ে শুরু করাটা শোভন।
৫. মূল বক্তব্য (Body of the Application)
এখানে আপনার মূল কথাগুলো গুছিয়ে লিখতে হবে। ভাষার ব্যবহার হতে হবে অত্যন্ত মার্জিত ও বিনয়ী। সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ (গুরুচণ্ডালী দোষ) করা যাবে না। চলিত ভাষায় লেখাটাই এখনকার স্ট্যান্ডার্ড। মূল বক্তব্যকে দুটি বা তিনটি প্যারাগ্রাফে ভাগ করে লিখলে পড়তে সুবিধা হয়। প্রথম প্যারায় নিজের পরিচয় এবং ক্লাসের পারফরম্যান্স, দ্বিতীয় প্যারায় আর্থিক সমস্যার বিবরণ এবং শেষ প্যারায় আপনার অনুরোধ বা প্রার্থনা জানাতে হবে।
দরখাস্তে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য উপস্থাপনের কৌশল
আবেদন পত্রে অনেকেই আবেগের বশে অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে ফেলেন, যা হিতে বিপরীত হতে পারে। মনে রাখবেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইলে আপনার দেওয়া তথ্য যাচাই করতে পারে। তাই সর্বদা সত্য তথ্য প্রদান করা শ্রেয়।
অভিভাবকের আয়: আপনার বাবার বা অভিভাবকের মাসিক বা বাৎসরিক আয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন। যদি আয়ের উৎস অনিয়মিত হয় (যেমন: দিনমজুর বা ছোট ব্যবসায়ী), তবে গড় আয়ের কথা লিখুন।
পরিবারের সদস্য সংখ্যা: আপনার বাবার আয়ের ওপর কতজন মানুষ নির্ভরশীল, তা উল্লেখ করা জরুরি। সদস্য সংখ্যা বেশি হলে এবং আয় কম হলে বেতন মওকুফ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
অন্যান্য ভাই-বোনের পড়াশোনা: যদি আপনার অন্য ভাই-বোনরাও পড়াশোনা করে এবং তাদের খরচও আপনার বাবাকে চালাতে হয়, তবে সেটি অবশ্যই উল্লেখ করবেন। এটি একটি শক্তিশালী পয়েন্ট।
নিচে একটি ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো কোন তথ্যগুলো আবেদনে হাইলাইট করা উচিত:
| তথ্যের ধরন | কী লিখবেন (Do’s) | কী বর্জন করবেন (Don’ts) |
| পেশা | নির্দিষ্ট পেশা (যেমন: কৃষক, রিক্সাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী) | অস্পষ্ট বর্ণনা (যেমন: তিনি কিছু করেন না) |
| আর্থিক অবস্থা | দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সংসার চালানো কষ্টকর | কাল্পনিক বা মিথ্যা অভাবের নাটকীয় বর্ণনা |
| ঠিকানা | বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা সঠিক ও নির্ভুলভাবে | ভুল বা অসম্পূর্ণ যোগাযোগ তথ্য |
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মেধার প্রমাণ
স্কুল কেন আপনাকে বেতন মওকুফ করে পড়াবে? কারণ আপনার মেধা আছে এবং আপনি ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল করবেন। এই সেকশনটি হলো আপনার নিজেকে প্রমাণ করার জায়গা। এখানে আপনাকে দেখাতে হবে যে, আপনি শুধু দরিদ্র নন, আপনি একজন ভালো ছাত্র বা ছাত্রীও বটে।
বিগত বার্ষিক পরীক্ষা বা অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় আপনি কত জিপিএ (GPA) বা নম্বর পেয়েছেন তা উল্লেখ করুন। রোল নম্বর যদি ১ থেকে ১০ এর মধ্যে হয়, তবে তা অবশ্যই হাইলাইট করবেন। এছাড়া ক্লাসে আপনার উপস্থিতির হার যদি ৯০% বা তার বেশি হয়, তবে সেটি উল্লেখ করতে ভুলবেন না। শিক্ষকরা নিয়মিত ছাত্রদের পছন্দ করেন। যদি আপনি কোনো সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে (Co-curricular activities) যেমন—বিতর্ক, খেলাধুলা, গান বা চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়ে থাকেন, তবে তাও সংক্ষেপে উল্লেখ করুন। এটি প্রমাণ করে যে আপনি স্কুলের একজন সম্পদ।
আবেগের সাথে যুক্তির ব্যবহার
শুধু “টাকা নেই” বললেই হবে না, বলতে হবে “টাকা নেই, কিন্তু পড়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা আছে”। আপনার জীবনের লক্ষ্য কী? ভবিষ্যতে আপনি কী হতে চান এবং এই পড়াশোনা আপনার জীবনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা দুই-এক লাইনে সুন্দর করে গুছিয়ে লিখুন।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি লিখতে পারেন, “স্যার, আমার ইচ্ছা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে দেশের সেবা করা। কিন্তু বর্তমানে আর্থিক অনটন আমার এই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” এই ধরনের বাক্য শিক্ষকের মনে সহানুভূতির সৃষ্টি করে। তবে খেয়াল রাখবেন, অতিরিক্ত আবেগ বা নাটকীয়তা যেন বিরক্তির কারণ না হয়। ভাষা হবে সংযত কিন্তু স্পর্শকাতর।
শুধু একটি সাদা কাগজে দরখাস্ত লিখে জমা দিলেই কাজ শেষ নয়। আপনার দাবির সত্যতা প্রমাণের জন্য কিছু সাপোর্টিং ডকুমেন্ট বা কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হয়। এগুলো আপনার আবেদনের ওজন বাড়ায় এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। সাধারণত যে কাগজগুলো জমা দিতে হয়:
১. আয়ের সনদপত্র: স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা গেজেটেড অফিসারের কাছ থেকে নেওয়া অভিভাবকের আয়ের সনদ।
২. মার্কশিট বা প্রোগ্রেস রিপোর্ট: বিগত পরীক্ষার ফলাফলের ফটোকপি।
৩. চারিত্রিক সনদ: প্রয়োজনবোধে স্কুল থেকে নেওয়া বা জনপ্রতিনিধির দেওয়া সনদ।
৪. সুপারিশ নামা: যদি সম্ভব হয়, আপনার ক্লাস টিচারের (শ্রেণি শিক্ষকের) একটি ছোট নোট বা স্বাক্ষর, যেখানে তিনি আপনার মেধা ও আচরণের প্রশংসা করেছেন।
এই কাগজগুলো স্টেপলার দিয়ে আবেদনের সাথে পিন করে জমা দেবেন। খাম বা ফাইলের ওপর নিজের নাম ও রোল নম্বর লিখতে ভুলবেন না।

বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য আবেদনের নমুনা
এতক্ষণ নিয়মকানুন জানলেন, এবার চলুন একটি বাস্তব নমুনা বা স্যাম্পল দেখে নেওয়া যাক। নিচের এই ফরম্যাটটি আপনি আপনার নাম ও তথ্যের সাথে মিলিয়ে এডিট করে ব্যবহার করতে পারেন। খেয়াল করুন, এখানে কোনো হেডার বা অপ্রয়োজনীয় অলঙ্করণ ব্যবহার করা হয়নি, এটি সম্পূর্ণ অফিশিয়াল ফরম্যাট।
তারিখ: ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬
বরাবর,
প্রধান শিক্ষক,
মডেল উচ্চ বিদ্যালয়,
সদর, ময়মনসিংহ।
বিষয়: বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য আবেদন।
জনাব,
সবিনয় নিবেদন এই যে, আমি আপনার বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের একজন নিয়মিত ছাত্র। আমার রোল নম্বর ০৩। আমি শুরু থেকেই এই বিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে পড়াশোনা করে আসছি। বিগত বার্ষিক পরীক্ষায় আমি জিপিএ ৫.০০ পেয়ে শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছি। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রতিটি ক্লাসে আমার উপস্থিতি সন্তোষজনক এবং আমি বিদ্যালয়ের বিতর্ক দলের একজন সক্রিয় সদস্য।
আমার বাবা একজন সামান্য দিনমজুর। তার পক্ষে একমাত্র উপার্জনে আমাদের পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ এবং আমার ও আমার ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ চালানো বর্তমানে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সংসারের খরচ মিটিয়ে আমার স্কুলের বেতন ও অন্যান্য ফি প্রদান করা তার সাধ্যের বাইরে। এমতাবস্থায়, অর্থের অভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা আমার এবং আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত হতাশার। আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে ভবিষ্যতে একজন প্রকৌশলী হয়ে দেশের সেবা করতে চাই।
অতএব, মহোদয়ের নিকট আকুল প্রার্থনা, আমার পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা এবং আমার পড়াশোর প্রতি আগ্রহ বিবেচনা করে, আমাকে বিদ্যালয়ের বেতন মওকুফ করে বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ দানে বাধিত করবেন।
নিবেদক,
আপনার একান্ত অনুগত ছাত্র,
মো: রায়হান আহমেদ
শ্রেণি: নবম
বিভাগ: বিজ্ঞান
রোল: ০৩
মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
(সংযুক্তি: অভিভাবকের আয়ের সনদপত্র ও বিগত পরীক্ষার মার্কশিট)
সাধারণ ভুল ও সতর্কতা
মানুষ মাত্রই ভুল করে, কিন্তু কিছু ভুল আপনার নিশ্চিত সুযোগটি কেড়ে নিতে পারে। আবেদন করার সময় শিক্ষার্থীরা সচরাচর যে ভুলগুলো করে থাকে, তা এড়িয়ে চলা জরুরি:
বানান ভুল: আবেদনে যদি প্রচুর বানান ভুল থাকে, তবে তা আপনার অমনোযোগিতা এবং অযোগ্যতা প্রকাশ করে। জমা দেওয়ার আগে একাধিকবার রিভিশন দিন।
মিথ্যা তথ্য: আয়ের ব্যাপারে বা পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিলে এবং তা ধরা পড়লে আপনি কেবল বৃত্তিই হারাবেন না, বরং টিসি (TC) বা শাস্তির মুখেও পড়তে পারেন।
অনানুষ্ঠানিক ভাষা: “স্যার, প্লিজ হেল্প করেন” বা “আমি খুব বিপদে আছি”—এজাতীয় ঘরোয়া বা ফেসবুকের ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। সবসময় দাপ্তরিক ভাষা বজায় রাখুন।
স্বাক্ষর না দেওয়া: অভিভাবক বা নিজের স্বাক্ষর ছাড়া আবেদন অগ্রহণযোগ্য। তারিখ দিতেও অনেকে ভুলে যান।
দেরিতে জমা দেওয়া: প্রতিটি আবেদনের একটি ডেডলাইন থাকে। বছরের মাঝখানে গিয়ে হঠাৎ আবেদন করলে সাধারণত ফান্ড খালি থাকে। তাই শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) আবেদন করা উচিত।
সফল আবেদন নিশ্চিত করার এক্সপার্ট টিপস
একজন এক্সপার্ট রাইটার হিসেবে আমার পরামর্শ হলো, আবেদনটি হাতে লিখলে হাতের লেখা যেন মুক্তার মতো বা অন্তত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়। যদি কম্পিউটারে কম্পোজ করেন, তবে স্ট্যান্ডার্ড ফন্ট (যেমন: Nikosh বা SutonnyMJ) ব্যবহার করবেন। এছাড়া, আবেদন জমা দেওয়ার সময় সরাসরি অফিস সহকারীর হাতে না দিয়ে, চেষ্টা করবেন প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করে নিজে জমা দিতে। এতে আপনার উপস্থিতি এবং ভদ্রতা শিক্ষকের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ক্লাস টিচার বা কোনো প্রিয় শিক্ষকের মাধ্যমে আবেদনটি সুপারিশ (Forwarding) করিয়ে নিতে পারলে মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০% বেড়ে যায়।
শিক্ষা অর্জন করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই অর্জনের পথে আসা বাধাগুলো দূর করাও আমাদের দায়িত্ব। আর্থিক অনটন যেন কোনো মেধাবী মুখের হাসি কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্যই বিনা বেতনে পড়ার এই ব্যবস্থা। একটি সুন্দর, মার্জিত এবং সঠিক নিয়মে লেখা বিনা বেতনে অধ্যয়নের জন্য আবেদন পত্র কেবল একটি চিঠি নয়, এটি আপনার স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি চাবিকাঠি। আশা করি, ওপরের গাইডলাইন এবং নমুনাটি অনুসরণ করে আপনি সহজেই আপনার আবেদনটি তৈরি করতে পারবেন। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, সত্য তথ্য দিন এবং বিনয়ের সাথে আবেদন করুন—সাফল্য আসবেই। আপনার শিক্ষা জীবন মসৃণ ও সুন্দর হোক, এই কামনাই করি।
