বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিকল্পনা এবং মানোন্নয়নে সঠিক তথ্যের ভূমিকা অপরিসীম। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) শিক্ষার সঠিক তথ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মিত এই জরিপ পরিচালনা করে থাকে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক নির্দেশনায় ব্যানবেইস জানিয়েছে, মূল জরিপের পর তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জরিপোত্তর যাচাই বা ‘পোস্ট এনুমেশন চেক’ (PEC) কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫-এর পিইসি কার্যক্রম, সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫ ও নতুন নির্দেশনা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা ব্যানবেইস প্রতি বছর দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। ২০২৫ সালের বার্ষিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপের প্রাথমিক পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে সংগৃহীত তথ্যের গুণগত মান এবং নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি। এই উদ্দেশ্যেই ব্যানবেইস নতুন করে জরিপোত্তর যাচাই কার্যক্রম বা পিইসি (PEC) পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ব্যানবেইস থেকে প্রকাশিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৫ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত এই বিশেষ যাচাই কার্যক্রম চলবে। এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো, প্রাথমিক জরিপে উঠে আসা তথ্যগুলোর বাস্তবিক সত্যতা মাঠ পর্যায়ে যাচাই করা। ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫-এর পূর্ণাঙ্গ সফলতার জন্য এই ধাপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জরিপোত্তর যাচাই বা পিইসি (PEC) কার্যক্রম কী?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, পিইসি কার্যক্রম আসলে কী? সহজ কথায়, মূল জরিপের পর তথ্যের নির্ভুলতা পরীক্ষার জন্য যে পুনরায় জরিপ চালানো হয়, তাকেই পিইসি বা পোস্ট এনুমেশন চেক বলা হয়।
প্রাথমিকোত্তর স্তরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অনলাইনে বা ম্যানুয়ালি যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তা কতটা সঠিক—তা যাচাই করতেই ব্যানবেইস এই উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষা সংক্রান্ত যে প্রতিবেদন বা পরিসংখ্যান তৈরি হবে, তা হবে আন্তর্জাতিক মানের এবং প্রশ্নাতীত।
কার্যক্রমের এলাকা ও নির্বাচন পদ্ধতি
ব্যানবেইস জানিয়েছে, এই যাচাই কার্যক্রম দেশের সব উপজেলায় একসঙ্গে হবে না। বরং পরিসংখ্যানগত শুদ্ধতা বজায় রাখতে ‘দৈবচয়ন’ (Random Sampling) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
জেলা নির্বাচন: দেশের ৬৪টি জেলা থেকেই তথ্য যাচাই করা হবে।
উপজেলা নির্বাচন: প্রতিটি জেলা থেকে দৈবচয়ন বা লটারির মাধ্যমে একটি করে উপজেলা বা থানা নির্বাচন করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট ৬৪টি নির্বাচিত উপজেলা/থানায় এই কার্যক্রম চলবে।
এই পদ্ধতির ফলে সারাদেশের একটি স্বচ্ছ চিত্র উঠে আসবে এবং তথ্যের বিভ্রাট ঘটার সম্ভাবনা কমে যাবে।
নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা ও বিবরণ
ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫-এর পিইসি কার্যক্রমের জন্য নির্বাচিত প্রতিটি উপজেলা থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাই করা হয়েছে। ব্যানবেইসের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি নির্বাচিত উপজেলা বা থানা থেকে মোট ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সশরীরে গিয়ে তথ্য যাচাই করা হবে।
নিচে নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন এবং সংখ্যার একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন | নির্বাচিত সংখ্যা (প্রতি উপজেলায়) |
| মাধ্যমিক বিদ্যালয় | ০৮ টি |
| স্কুল অ্যান্ড কলেজ | ০১ টি |
| মাদরাসা | ০৪ টি |
| কলেজ (উচ্চ মাধ্যমিক/ডিগ্রি) | ০১ টি |
| কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান | ০১ টি |
| মোট প্রতিষ্ঠান | ১৫ টি |
এই ১৫টি প্রতিষ্ঠানে ব্যানবেইস কর্তৃক নিয়োগকৃত তথ্যসংগ্রহকারীরা সরাসরি উপস্থিত হবেন। তারা প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার খাতা, হাজিরা খাতা এবং অন্যান্য রেকর্ডপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবেন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের করণীয় ও সহযোগিতা
যেকোনো সরকারি জরিপ কার্যক্রম সফল করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য। ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫-এর পিইসি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য ব্যানবেইস মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের ভূমিকা
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচিত ৬৪টি উপজেলা ও থানার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের এই কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। তাদের প্রধান দায়িত্বগুলো হলো:
তথ্যসংগ্রহকারীদের স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুঁজে পেতে সহায়তা করা।
প্রতিষ্ঠান প্রধানদের আগে থেকেই অবহিত করা যাতে তারা প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখেন।
তথ্য যাচাইয়ের সময় কোনো অসংগতি দেখা দিলে তা নিরসনে সহায়তা করা।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে (২৫ জানুয়ারি – ৫ ফেব্রুয়ারি) কার্যক্রম শেষ করতে তদারকি করা।
ব্যানবেইস বিশ্বাস করে, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া নির্ভুল ডেটাবেজ তৈরি করা কঠিন।
তথ্যের গুণগত মান ও ব্যানবেইসের লক্ষ্য
বর্তমান যুগে ডেটা বা তথ্যই হলো উন্নয়নের চাবিকাঠি। শিক্ষা খাতের বাজেট প্রণয়ন, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি, শিক্ষক নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকারের সঠিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫-এর মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে:
১. দেশে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর প্রকৃত হার কত।
২. জেন্ডার সমতা বা ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত কেমন।
৩. কারিগরি শিক্ষার প্রসার কতটুকু হয়েছে।
৪. মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান অবস্থা কী।
পিইসি কার্যক্রমের মাধ্যমে যদি দেখা যায় মূল তথ্যের সাথে মাঠ পর্যায়ের তথ্যের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে, তবে তা সংশোধন করা হবে। এর ফলে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন আরও বাস্তবসম্মত হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্মার্ট শিক্ষাব্যবস্থা
ব্যানবেইসের এই জরিপ কার্যক্রম স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার একটি অংশ। আগে যেখানে ফাইলের স্তূপে তথ্য হারিয়ে যেত, এখন সেখানে ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি হচ্ছে। ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫ সম্পন্ন হলে, এক ক্লিকেই দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যাবে।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের জন্য এই ডেটাবেজ হবে একটি অমূল্য সম্পদ। তাই তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই সততার সাথে সঠিক তথ্য প্রদান করতে হবে। ভুল তথ্য দিলে তা শুধু জরিপকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে না, বরং জাতীয় পরিকল্পনাকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
পরিশেষে বলা যায়, ব্যানবেইস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জরিপ ২০২৫ এবং এর পরবর্তী পিইসি কার্যক্রম দেশের শিক্ষা খাতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সঠিক তথ্যের কোনো বিকল্প নেই।
নির্বাচিত উপজেলাগুলোর মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠান প্রধানদের উচিত এই কার্যক্রমে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা। আশা করা যায়, আগামী ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এই যাচাই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে এবং আমরা একটি নির্ভুল ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিবেদন পাব। শিক্ষা সংক্রান্ত এমন আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।
