মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন। বর্তমান সমাজে মাদকাসক্তি বা Drug Addiction কেন বাড়ছে, এর ভয়াবহ পরিণাম এবং যুবসমাজকে রক্ষার উপায় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন। সুস্থ জীবনের জন্য এই লেখাটি পড়ুন।
মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার রচনা 20 পয়েন্ট
ভূমিকা মাদকাসক্তি বর্তমান সময়ের এক জ্বলন্ত সমস্যা, যা আমাদের সমাজব্যবস্থাকে এবং বিশেষ করে যুবসমাজকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকাসক্তি শব্দটির সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত, কিন্তু এর ভয়াবহতা ও গভীরতা কতটুকু তা হয়তো অনেকেই অনুভব করতে পারি না। আদিকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন ধরণের নেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে, কিন্তু বর্তমান যুগে এসে এটি একটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। যখন একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কোনো নির্দিষ্ট দ্রব্য গ্রহণের ফলে তার মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং সেই দ্রব্যের ওপর তীব্রভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখনই তাকে আমরা মাদকাসক্ত বলি। এই সর্বনাশা নেশা একবার কাউকে গ্রাস করলে সেখান থেকে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীর জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার, আর তার পরিবারে শুরু হয় এক দুর্বিষহ যমজাতনা। আমাদের আজকের এই আর্টিকেলে আমরা মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যা আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে সচেতন করতে সাহায্য করবে।
মাদকাসক্তি আসলে কী: সহজ কথায় বলতে গেলে, বিভিন্ন ধরণের নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করার প্রবল ইচ্ছাই হলো মাদকাসক্তি। এটি এমন এক ধরণের আসক্তি যা মানুষকে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক কাল্পনিক জগতে নিয়ে যায়। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। নেশা করার পর ক্ষণিকের জন্য হয়তো মনের সকল যন্ত্রণা, হতাশা বা কষ্ট ভুলে থাকা যায়, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল অত্যন্ত ভয়াবহ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে তার বিবেক, বুদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে।
মাদকদ্রব্য হিসেবে আমাদের সমাজে বহু ধরণের উপকরণের ব্যবহার দেখা যায়। এর মধ্যে মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, চরস উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমান সময়ে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে মারিজুয়ানা, ইয়াবা, প্যাথেড্রিন, কোকেন এবং ফেনসিডিল-এর মতো ভয়ানক সব মাদকের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে হিরোইন বা Heroin এর জনপ্রিয়তা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তা রীতিমতো আতঙ্কের কারণ। এই দ্রব্যগুলো মানুষের মস্তিষ্ককে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে, মাদক না পেলে শরীর ও মনে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি হয়, যা ব্যক্তিকে যেকোনো অপরাধ করতে বাধ্য করে।
আরও পড়ুনঃ বাংলার কৃষক রচনা ২৫ পয়েন্ট
মাদকাসক্তির কারণসমূহ: মানুষ কেন মাদকের দিকে ঝুঁকছে? এর পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই, বরং অনেকগুলো কারণ কাজ করে। মাদকাসক্তি বা Drug Addiction এর সূত্রপাত ঘটে সাধারণত কৌতূহল থেকে। কিন্তু এই কৌতূহল একসময় মরণফাঁদে পরিণত হয়। নিচে এর প্রধান কারণগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. হতাশা ও ব্যর্থতা: জীবনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা, প্রেমে ব্যর্থতা কিংবা পারিবারিক অশান্তি মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়। এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের আশ্রয় নেয়।
২. সঙ্গদোষ: “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ”— এই প্রবাদটি মাদকের ক্ষেত্রে শতভাগ সত্য। বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে বা তাদের প্ররোচনায় অনেকেই প্রথমবারের মতো মাদক গ্রহণ করে। পরবর্তীতে সেটি অভ্যাসে পরিণত হয়।
৩. বেকারত্ব ও দারিদ্র্য: আমাদের দেশে বেকার সমস্যা প্রকট। কর্মসংস্থান না থাকায় এবং দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট হয়ে অনেক যুবক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই হতাশা থেকেই তারা নেশার জগতে প্রবেশ করে।
৪. নৈতিক মূল্যবোধের অভাব: পারিবারিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। ছোটবেলা থেকে যদি সন্তানের মধ্যে ভালো-মন্দের বিচারবোধ তৈরি না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে তারা সহজেই বিপথগামী হতে পারে।
৫. সহজলভ্যতা: হাতের কাছেই যদি মাদক পাওয়া যায়, তবে আসক্তি বাড়বেই। কালো টাকার প্রভাব এবং প্রশাসনের নজরদারির অভাবে মাদকদ্রব্য আজ পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে।
মাদকাসক্তির ক্ষতিকর দিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া: মাদকদ্রব্য গ্রহণের ইতিহাস সুপ্রাচীন হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব এখন সবচাইতে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একসময় চীন দেশে আফিম খাওয়ার প্রচলন ছিল যা পুরো জাতিকে অলস ও কর্মবিমুখ করে দিয়েছিল। বর্তমানে মাদকাসক্তির ফলে মানুষের শরীরে এবং মনে যে পরিবর্তনগুলো হয় তা নিচে তুলে ধরা হলো:
শারীরিক ক্ষতি: নিয়মিত মাদক সেবনের ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া, হার্ট অ্যাটাক এবং মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের মতো জটিল রোগ দেখা দেয়। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইডস (AIDS) এবং হেপাটাইটিস বি-এর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এছাড়া চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, ওজন হ্রাস পাওয়া এবং হজমশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া মাদকের সাধারণ লক্ষণ।
মানসিক বিপর্যয়: মাদকাসক্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে সবসময় এক ধরণের ভয় বা আতঙ্ক কাজ করে। ঘুমের সমস্যা, অতিরিক্ত মেজাজ খিটখিটে হওয়া, এবং স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া মাদকের অন্যতম কুফল। অনেক সময় মাদকের প্রভাবে মানুষ হ্যালুসিনেশনে ভোগে এবং আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে।
পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাব: মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত জীবনকেই ধ্বংস করে না, এটি একটি পরিবার এবং সমাজকেও ধ্বংস করে দেয়। একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্ত সদস্য থাকা মানে পুরো পরিবারের জন্য অশান্তি ডেকে আনা। নেশার টাকার জন্য সন্তান বাবা-মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করে, ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে দেয়, এমনকি চুরি-ডাকাতিতেও জড়িয়ে পড়ে।
সামাজিকভাবে মাদকাসক্তরা নিগৃহীত হয়। কেউ তাদের বিশ্বাস করতে চায় না। সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির মূল কারণগুলোর মধ্যে মাদক অন্যতম। চুরি, ছিনতাই, হত্যা এবং ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে মাদকাসক্তদের সরাসরি সংযোগ পাওয়া যায়। মাদকের কারণে সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তা একটি সুস্থ জাতির জন্য কাম্য নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদকের ভয়াবহতা: উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও মাদকের ব্যবহার আজ এক জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মাদক চোরাচালানের একটি রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের দেশে মাদক উৎপাদনের চেয়ে বাইরে থেকে আসা মাদকের ব্যবহারই বেশি।
পরিসংখ্যান ও বর্তমান অবস্থা: যদিও সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের সাথে জড়িত। এর মধ্যে একটি বড় অংশই হলো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাংলাদেশে প্রায় ৩৫০টি বৈধ গাঁজার দোকান রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া সরকারের অনুমতিতে কেরু এন্ড কোম্পানি মদ উৎপাদন করে। কিন্তু এর বাইরে অবৈধভাবে হাজার হাজার লিটার দেশি মদ তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। ফেনসিডিল ও ইয়াবার আগ্রাসন গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান— কেউ এই নীল দংশন থেকে মুক্ত নয়। বিশেষ করে বস্তি এলাকাগুলোতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার লক্ষ্য করা যায়। রিকশাচালক, বাস ড্রাইভারদের মধ্যে অনেকেই মাদক সেবন করে যা সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মাদকদ্রব্যের ধরণ ও বিবর্তন: সময়ের সাথে সাথে মাদকের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগেকার দিনে মানুষ গাঁজা, ভাং বা আফিমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু আধুনিক রসায়নবিদ্যার অপব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে সিন্থেটিক ড্রাগস।
১. হিরোইন (Heroin): এটি অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাদক যা আফিম থেকে তৈরি হয়। এটি মস্তিষ্কের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলে এবং আসক্তি তৈরি করে। এটি অনেক দামি এবং এর ক্ষতিকর প্রভাবও অনেক বেশি।
২. ইয়াবা: মেদ কমানোর ওষুধ হিসেবে আবিষ্কৃত হলেও বর্তমানে এটি ভয়াবহ নেশার দ্রব্য। এটি মানুষকে সাময়িক উত্তেজনা দেয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক অকেজো করে দেয়।
৩. ফেনসিডিল: একসময় এটি কাশির সিরাপ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এর মধ্যে কোডিন ফসফেট থাকায় এটি নেশার দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
৪. অন্যান্য: কোকেন, এলএসডি (LSD), ঘুমের ওষুধ এবং ড্যান্ডি (জুতা লাগানোর আঠা) বর্তমানে নেশার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি ব্যথানাশক ইনজেকশনও নেশার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: মাদক সেবনের মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো বেশ গভীর। অনেক সময় দেখা যায়, সাময়িক জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা বা নেতিবাচক মনোভাব থেকে মানুষ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আধুনিক ধনতান্ত্রিক সমাজে ভোগবাদী মানসিকতা মানুষকে সবসময় অতৃপ্ত রাখে। চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে যখন বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়, তখন মানুষ হতাশায় ভোগে।
মিডিয়ার প্রভাব: সিনেমা, ওয়েব সিরিজ বা মিউজিক ভিডিওতে অনেক সময় মাদক গ্রহণকে এক ধরণের “স্মার্টনেস” বা “গ্ল্যামার” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তরুণরা তাদের প্রিয় নায়কদের অনুকরণ করতে গিয়ে ধূমপানে আসক্ত হয় এবং পরে তা মাদকে গড়ায়। এছাড়া পারিবারিক কলহ, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, একাকীত্ব এবং ভালোবাসার অভাব তরুণ মনকে বিষিয়ে তোলে, যা তাদের নেশার জগতের দিকে ঠেলে দেয়।
মাদকের আন্তর্জাতিক উৎস ও চোরাচালান: মাদক সমস্যাটি কোনো একক দেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। মাদকের উৎপাদনের জন্য বিশ্বের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল বিখ্যাত। এর মধ্যে রয়েছে:
১. গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (Golden Triangle): লাওস, মায়ানমার এবং থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি মাদক উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র। এখান থেকে প্রচুর পরিমাণে আফিম ও হিরোইন সারা বিশ্বে পাচার হয়।
২. গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (Golden Crescent): পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং ইরান নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটিও মাদক উৎপাদনের জন্য পরিচিত।
৩. গোল্ডেন ওয়েজ: এটি হিরোইনের আরেকটি মূল উৎস।
মাদকের কাঁচামাল পপি ফুল থেকে তৈরি হয় কাঁচা আফিম, যা পরবর্তীতে প্রসেসিং করে মরফিন এবং হিরোইন তৈরি করা হয়। এছাড়া কলম্বিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো প্রভৃতি দেশে কোকেন ও মারিজুয়ানা উৎপন্ন হয়।
বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিকভাবে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এবং গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায়, আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে “ট্রানজিট রুট” হিসেবে ব্যবহার করে। ভারত ও মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে।
বিশ্বব্যাপী মাদকের প্রতিক্রিয়া: মাদকের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে বিশ্বের কোনো দেশই নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও মাদকাসক্তি এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। কোটি কোটি মানুষ সেখানে কোকেন, মারিজুয়ানা এবং হিরোইনে আসক্ত। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেও একই চিত্র। এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাদকের বিস্তার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত মাফিয়া চক্রগুলো এতই শক্তিশালী যে, অনেক সময় রাষ্ট্রযন্ত্রও তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা এবং সন্ত্রাসবাদের সাথে মাদক ব্যবসার গভীর যোগাযোগ রয়েছে।
মাদকাসক্তির পরিণাম ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম: আমাদের তরুণ সমাজ আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। মাদকের খপ্পরে পড়ে তাদের সম্ভাবনাময় জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেধা ও মননের অপমৃত্যু ঘটছে। আজকের যে তরুণটি ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল, সে আজ নেশার ঘোরে অন্ধকার গলিতে পড়ে থাকছে।
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, ইভটিজিং এবং কিশোর গ্যাং কালচারের পেছনে মাদকের বড় ভূমিকা রয়েছে। তরুণরা সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থা, আইন বা গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলছে। তাদের নৈতিক স্খলন ঘটছে চরমভাবে। এভাবে চলতে থাকলে জাতি হিসেবে আমরা মেধাশূন্য হয়ে পড়ব। একটি মেরুদণ্ডহীন প্রজন্ম নিয়ে কোনো দেশ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
মাদকবিরোধী আন্দোলন: বিশ্ব ও বাংলাদেশ: মাদকের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়েছে অনেক আগেই। যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম মাদক প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেয়। ১৯৮৭ সালে বিশ্বের ২৩টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মাদকবিরোধী আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করে। মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে। ইরানে মাদক ব্যবসার দায়ে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশেও মাদক নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ১৯৯০ সালে ঢাকায় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন বড় শহরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার বা Rehabilitation Center গড়ে উঠেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় এই উদ্যোগগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
কেন মাদকের বিস্তার রোধ করা যাচ্ছে না: এত অভিযান এবং সচেতনতার পরেও মাদকের বিস্তার কেন কমছে না? এর প্রধান কারণ হলো অসাধু ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভে অনৈতিক ব্যবসা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাফিয়া চক্র। তারা পরিকল্পিতভাবে একটি দেশের যুবসমাজকে ধ্বংস করার জন্য মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতির কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এই ব্যবসা পরিচালিত হয় বলে তাদের ধরা ছোঁয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মাদকাসক্তি প্রতিরোধে আমাদের করণীয়: মাদকাসক্তি প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। একবার আসক্ত হয়ে গেলে চিকিৎসা করা কঠিন, তাই যাতে কেউ আসক্ত না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য আমাদের সমাজপতি, সরকার এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সমাজের নেতাদের কর্তব্য: প্রতিটি মহল্লা বা গ্রামের সমাজপতিরা যদি উদ্যোগ নেন যে তাদের এলাকায় কোনো মাদক বিক্রি বা সেবন করতে দেওয়া হবে না, তবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যুব সংঘ বা ক্লাবগুলোকে মাদকবিরোধী প্রচারণায় কাজে লাগাতে হবে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে যাতে তরুণরা অবসর সময়ে বাজে আড্ডায় না লিপ্ত হয়।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা: সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো মাদকের উৎস মুখ বন্ধ করা। সীমান্তে কড়া পাহারা বসাতে হবে যাতে এক ফোঁটা মাদকও দেশে ঢুকতে না পারে। পুলিশ ও প্রশাসনকে আরও সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। “জিরো টলারেন্স” নীতি শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা: টিভি, পত্রিকা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাতে হবে। মাদকের কুফল সম্পর্কে নাটক, সিনেমা ও বিজ্ঞাপন প্রচার করে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।
মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির উপায় ও চিকিৎসা: কেউ যদি দুর্ভাগ্যবশত মাদকে আসক্ত হয়েই পড়ে, তবে তাকে ঘৃণা না করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি একজন রোগী, অপরাধী নয়।
১. মোটিভেশন ও কাউন্সেলিং: আসক্ত ব্যক্তিকে বোঝাতে হবে যে সে ভুল পথে আছে এবং এখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব। পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা ও সমর্থন এখানে সবচেয়ে বড় ওষুধ হিসেবে কাজ করে।
২. নিরাময় কেন্দ্র: সরকারি ও বেসরকারি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে ডিটক্সিফিকেশন (Detoxification) এবং সাইকোথেরাপির মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হয়।
৩. পুনর্বাসন: চিকিৎসা শেষে ফিরে আসার পর তাকে যাতে আবার পুরনো পরিবেশে মিশতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিতে হবে যাতে সে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে পারে।
৪. আধ্যাত্মিক চর্চা: ধর্মীয় অনুশাসন এবং আধ্যাত্মিক চর্চা মানুষের মনের জোর বাড়াতে সাহায্য করে। নামাজ, প্রার্থনা বা ধ্যানের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক সংস্থার দায়িত্ব: মাদক সমস্যাটি যেহেতু আন্তর্জাতিক, তাই এর সমাধানও আন্তর্জাতিকভাবে হতে হবে। ইন্টারপোল এবং জাতিসংঘের মতো সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদক উৎপাদনকারী দেশগুলোকে চাপ দিতে হবে উৎপাদন বন্ধ করার জন্য। তথ্যের আদান-প্রদান এবং যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাদক চক্রকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে।
উপসংহার: মাদকাসক্তি বা Drug Addiction এখন আর কোনো একক পরিবারের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ। মুনাফালোভী ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে এই বিষবৃক্ষ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। কিন্তু আমরা হাল ছেড়ে দিতে পারি না। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থেই এই ব্যাধির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
বেকারত্বের অভিশাপ ঘুচিয়ে তরুণদের কর্মমুখী করতে হবে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে তাদের নৈতিক চরিত্র গঠন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারের ভালোবাসা এবং সঠিক গাইডলাইনই পারে সন্তানকে এই মরণনেশা থেকে দূরে রাখতে। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি “মাদককে না বলি, জীবনকে ভালোবাসি“। যেদিন আমরা সমস্বরে গেয়ে উঠতে পারব মাদকবিরোধী গান, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারব প্রতিটি ঘরে ঘরে, সেদিনই আমাদের সমাজ হবে কলুষমুক্ত। মনে রাখবেন, জীবন একটাই এবং তা অত্যন্ত মূল্যবান। ক্ষণিকের ভুলে এই সুন্দর জীবনকে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। আসুন সচেতন হই, সুস্থ থাকি এবং আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলি।
আরও পড়ুনঃ দেশভ্রমণ রচনা ২০ পয়েন্ট
