পরিবেশ দূষণ রচনা Class 5
ভূমিকা
আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, তা নিয়েই আমাদের পরিবেশ। গাছপালা, নদী-নালা, পশুপাখি আর আমরা মানুষ সবকিছুই পরিবেশের অংশ। আমরা যেহেতু এই পরিবেশেই বড় হই, তাই একে সুস্থ রাখার দায়িত্বও আমাদের। বর্তমানে পরিবেশ দূষণ বা environment pollution এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে আমাদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। পরিবেশ ভালো না থাকলে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব। তাই পরিবেশকে বলা হয় আমাদের বেঁচে থাকার মূল আধার।
পরিবেশ দূষণ বলতে কী বোঝায়?
সভ্যতার শুরুতে পৃথিবী ছিল সবুজে ঘেরা এক শান্ত জায়গা। তখন কোনো কলকারখানা বা শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্র ছিল না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষ উন্নত হয়েছে এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। এই উন্নতির আড়ালে আমরা প্লাস্টিক ও ক্ষতিকারক রাসায়নিক ব্যবহার করে পরিবেশের স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট করে ফেলেছি। বাতাস, মাটি এবং পানিকে বিভিন্ন বর্জ্য দিয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলাকেই মূলত পরিবেশ দূষণ বলা হয়। এক কথায়, প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই হলো দূষণ।
পরিবেশ দূষণের প্রকারভেদ
পরিবেশের প্রধান উপাদানগুলো নষ্ট হওয়ার ওপর ভিত্তি করে পরিবেশ দূষণকে চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো: soil pollution বা মাটি দূষণ, air pollution বা বায়ু দূষণ, water pollution বা জল দূষণ এবং noise pollution বা শব্দ দূষণ। প্রতিটি দূষণই আমাদের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণসমূহ
মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা জীব দাবি করলেও পরিবেশ নষ্ট করার পেছনে প্রধান ভূমিকা মানুষেরই। আমরা অপরিকল্পিতভাবে ঘরবাড়ি এবং শিল্পকারখানা তৈরি করছি। এর ফলে বনাঞ্চল ধ্বংস হচ্ছে। বনের গাছ কেটে আমরা সেখানে বড় বড় অট্টালিকা বানাচ্ছি। অথচ সেই গাছের অভাব পূরণের জন্য আমরা যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছি না। এই অপরিকল্পিত নগরায়নই সব ধরণের দূষণের মূল কারণ।
মাটি দূষণ ও এর ক্ষতিকর দিক
কৃষ জমিতে অধিক ফলন পাওয়ার আশায় কৃষকরা প্রচুর পরিমাণে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। এই কেমিক্যালগুলো সরাসরি মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে এবং মাটিকে বিষাক্ত করে তুলছে। এছাড়া কলকারখানার বর্জ্য এবং প্লাস্টিক মাটিতে মিশে soil pollution ত্বরান্বিত করছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় মাটির ক্ষয় বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তেজস্ক্রিয় পদার্থও মাটির মারাত্মক ক্ষতি করে।
বায়ু দূষণ ও জনস্বাস্থ্য
যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া বর্তমানে বায়ু দূষণের প্রধান কারণ। উৎসবের সময় বাজি পোড়ানো বা ময়লা আবর্জনা পোড়ানোর ফলে যে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়, তা বাতাসের অক্সিজেন কমিয়ে দেয়। প্রতিদিন রাস্তায় বেরোলে আমরা যে বিষাক্ত বাতাস নিচ্ছি, তা আমাদের ফুসফুসকে অকেজো করে দিচ্ছে। বড় বড় শহরের বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবী ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
জল দূষণ ও এর উৎস
নদী বা পুকুরে কলকারখানার বর্জ্য ফেলা জল দূষণের অন্যতম কারণ। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে জলাশয়ে মেশে। এছাড়া ডিটারজেন্ট পাউডার এবং বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ যেমন ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম পানিতে মিশে পানিকে বিষাক্ত করে তোলে। এই দূষিত পানি পান করার ফলে মানুষ ও জলজ প্রাণীরা কঠিন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
শব্দ দূষণ ও আমাদের অসচেতনতা
জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে যানবাহনের সংখ্যাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ট্রাফিক জ্যামে আটকে থেকে চালকরা অকারণে হর্ন বাজান, যা মারাত্মক noise pollution তৈরি করে। বিভিন্ন ধর্মীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উচ্চশব্দে বক্স বাজানো বা বাজি ফাটানোর কারণে আমাদের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় শব্দ দূষণ এখন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবজীবনে পরিবেশ দূষণের ভয়াবহ প্রভাব
আমরা যে পরিবেশে বাস করছি, তাকে আমরা নিজেরাই বিষাক্ত করে তুলছি। এর ফলে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। দূষিত বাতাস থেকে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের ক্যানসার হচ্ছে। আবার মাটি দূষণের ফলে উৎপন্ন ফসল খেয়ে আমাদের পেটের সমস্যা ও চর্মরোগ দেখা দিচ্ছে। এমনকি গবাদি পশুর মাধ্যমেও এই বিষ আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে। অতিরিক্ত শব্দ দূষণের ফলে মানুষের রক্তচাপ বাড়ছে এবং হার্টের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
পরিবেশ দূষণ প্রতিকারের উপায়
পরিবেশকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। কৃষিকাজে জৈব সার ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং ক্ষতিকর কীটনাশক বর্জন করতে হবে। কলকারখানার ধোঁয়া ও বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের চেয়ে গণপরিবহন বা শেয়ারিং গাড়ি ব্যবহারের অভ্যাস গড়তে হবে। এতে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমবে এবং বায়ু ও শব্দ দূষণ অনেকাংশে হ্রাস পাবে। সবচেয়ে বড় সমাধান হলো বেশি করে গাছ লাগানো এবং বন রক্ষা করা।
উপসংহার
পরিবেশ আমাদের মায়ের মতো, তাই তাকে রক্ষা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য। আমরা যদি আজ সচেতন না হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক বিষাক্ত পৃথিবীতে জন্ম নেবে। অকারণে হর্ন বাজানো বন্ধ করা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং গাছ লাগানোর মাধ্যমে আমরা একটি সতেজ পরিবেশ গড়ে তুলতে পারি। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য দূষণমুক্ত পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই।



