অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম। যেকোনো বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম

পরীক্ষার রেজাল্ট মানেই এক বুক ধড়ফড়ানি, তাই না? বিশেষ করে যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের রেজাল্ট দেয়, তখন অনেকেই তাদের প্রাপ্ত গ্রেড বা পয়েন্ট দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। আরে ভাই, এ প্লাস বা এ মাইনাস তো বুঝলাম, কিন্তু আসল সিজিপিএ কত হলো? এই প্রশ্নটা প্রায় সব শিক্ষার্থীর মনেই ঘোরে। আপনি যদি অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম সঠিক জানা না থাকে, তবে নিজের রেজাল্ট নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক।

আর্টিকেলের বিষয়সূচী

অনেকেই ইন্টারনেটে বা বড় ভাই-আপুদের কাছে জানতে চান  অনার্স ১ম বর্ষের রেজাল্ট সিজিপিএ বের করার নিয়ম অথবা অনার্স পয়েন্ট বের করার নিয়ম সম্পর্কে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, বিষয়টি মোটেও রকেট সায়েন্স নয়! একটু ঠান্ডা মাথায় হিসাব করলেই আপনি নিজেই নিজের ক্যালকুলেটর চেপে রেজাল্ট বের করতে পারবেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা খুব সহজ ভাষায় এবং উদাহরণের মাধ্যমে  অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম ধাপে ধাপে আলোচনা করব। সাথে এটাও জানাব যে অনার্স সিজিপিএ রেজাল্ট কিভাবে দেখব এবং ভালো সিজিপিএ করার টেকনিক কী। চলুন তবে শুরু করা যাক!

অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম কেন জানা জরুরি?

ভাবছেন, রেজাল্ট তো বিশ্ববিদ্যালয় দিবেই, আমার আবার কষ্ট করে হিসাব করার কী দরকার? কিন্তু বিষয়টি এতটাও সরল নয়। আপনি যখন জানবেন আপনার কোন কোর্সে কত পয়েন্ট এসেছে এবং সেটি আপনার মোট সিজিপিএ-তে কীভাবে প্রভাব ফেলছে, তখন পরবর্তী সেমিস্টারের জন্য আপনি ভালো পরিকল্পনা করতে পারবেন।

তাছাড়া, অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম জানা থাকলে আপনি বুঝতে পারবেন যে ৪ ক্রেডিটের একটি সাবজেক্টে খারাপ করলে তা কীভাবে আপনার পুরো রেজাল্ট নামিয়ে দিতে পারে। নিজের একাডেমিক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হলে এই হিসাব নিকাশ জানাটা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য ফরজ বলা চলে।

অনার্স সিজিপিএ কী এবং এটি কীভাবে ফলাফলে প্রভাব ফেলে?

সিজিপিএ (CGPA) এর পূর্ণরূপ হলো Cumulative Grade Point Average। সোজা বাংলায় বলতে গেলে, আপনার অনার্সের চার বছরের সব কোর্সের গড় ফলাফল। আর জিপিএ (GPA) হলো কোনো নির্দিষ্ট সেমিস্টার বা বর্ষের ফলাফল।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ৪.০০ স্কেলে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। আপনার ফাইনাল রেজাল্ট যখন তৈরি হয়, তখন ১ম বর্ষ থেকে ৪র্থ বর্ষ পর্যন্ত সব ফলের সমন্বয়ে এই সিজিপিএ তৈরি হয়। তাই অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম ভালোভাবে বুঝলে আপনি আপনার দুর্বল জায়গাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করতে পারবেন।

অনার্সে গ্রেডিং সিস্টেম ও গ্রেড পয়েন্টের কাঠামো

হিসাব কষার আগে আমাদের জানতে হবে কোন নাম্বারের জন্য কত পয়েন্ট বা গ্রেড দেওয়া হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিচের চার্ট অনুযায়ী গ্রেডিং করা হয়:

নম্বর (Marks)লেটার গ্রেড (Letter Grade)গ্রেড পয়েন্ট (Grade Point)
৮০% বা তার বেশিA+৪.০০
৭৫% থেকে ৭৯%A৩.৭৫
৭০% থেকে ৭৪%A-৩.৫০
৬৫% থেকে ৬৯%B+৩.২৫
৬০% থেকে ৬৪%B৩.০০
৫৫% থেকে ৫৯%B-২.৭৫
৫০% থেকে ৫৪%C+২.৫০
৪৫% থেকে ৪৯%C২.২৫
৪০% থেকে ৪৪%D২.০০
৪০% এর কমF০.০০

অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম বুঝতে ক্রেডিট সিস্টেম জানা

অনেকেই মনে করেন সব সাবজেক্টের গুরুত্ব সমান, কিন্তু এখানেই বড় ভুলটা হয়! অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম বুঝতে হলে আপনাকে ‘ক্রেডিট’ (Credit) সম্পর্কে জানতে হবে। সহজ কথায়, ক্রেডিট হলো ওই কোর্সটি কতটা বড় বা গুরুত্বপূর্ণ।

সাধারণত ১০০ নম্বরের কোর্সের জন্য ৪ ক্রেডিট এবং ৫০ নম্বরের কোর্সের জন্য ২ ক্রেডিট থাকে। প্র্যাকটিক্যাল বা ভাইভা কোর্সের ক্রেডিট ভিন্ন হতে পারে। মনে রাখবেন, ৪ ক্রেডিটের সাবজেক্টে আপনি যা গ্রেড পাবেন, তা আপনার সিজিপিএ-তে ৪ গুণ বেশি প্রভাব ফেলবে। তাই ৪ ক্রেডিটের বিষয়ে এ প্লাস পাওয়া আর ২ ক্রেডিটের বিষয়ে এ প্লাস পাওয়ার মধ্যে বিশাল তফাৎ আছে।

অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম: প্রতি কোর্সের GPA হিসাব করার পদ্ধতি

এবার আসুন মূল অংকে যাওয়া যাক। অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম এর প্রথম ধাপ হলো প্রতিটি কোর্সের আলাদা পয়েন্ট বের করা। সূত্রটি খুব সহজ:

অর্জিত পয়েন্ট = গ্রেড পয়েন্ট × ওই কোর্সের ক্রেডিট সংখ্যা

উদাহরণস্বরূপ, ধরুন আপনি ‘বাংলা’ বিষয়ে (যার ক্রেডিট ৪) ‘A-‘ পেয়েছেন। চার্ট অনুযায়ী ‘A-‘ এর মান ৩.৫০।
তাহলে, বাংলায় আপনার অর্জিত পয়েন্ট = ৩.৫০ × ৪ = ১৪.০০।

আবার ধরুন, আপনি ‘ইংরেজি’ বিষয়ে (যার ক্রেডিট ২) ‘A+’ পেয়েছেন। চার্ট অনুযায়ী ‘A+’ এর মান ৪.০০।
তাহলে, ইংরেজিতে আপনার অর্জিত পয়েন্ট = ৪.০০ × ২ = ৮.০০।

অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়মে মোট CGPA গণনার সূত্র

একবার যখন আপনি সব বিষয়ের অর্জিত পয়েন্ট বের করে ফেলবেন, তখন মোট জিপিএ বের করা পানির মতো সহজ হয়ে যাবে। সূত্রটি হলো:

GPA = (সব কোর্সের মোট অর্জিত পয়েন্ট) ÷ (সব কোর্সের মোট ক্রেডিট সংখ্যা)

এই একই পদ্ধতি ব্যবহার করে আপনি অনার্স ১ম বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম থেকে শুরু করে অনার্স ফাইনাল ইয়ারের সিজিপিএ বের করার নিয়ম পর্যন্ত সব হিসাব করতে পারবেন। শুধু মনে রাখবেন, ভাগ করার সময় বিষয় সংখ্যা দিয়ে ভাগ করবেন না, বরং মোট ক্রেডিট দিয়ে ভাগ করবেন।</

অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম উদাহরণসহ ব্যাখ্যা

চলুন একটি কাল্পনিক ছাত্র ‘রহিম’-এর ১ম বর্ষের ফলাফল দিয়ে বিষয়টি একদম পরিষ্কার করে নিই। রহিমের ৩টি বিষয় ছিল।

  • বিষয় ১ (ক্রেডিট ৪): পেয়েছে A+ (৪.০০)। পয়েন্ট = ৪ × ৪ = ১৬।
  • বিষয় ২ (ক্রেডিট ৪): পেয়েছে B (৩.০০)। পয়েন্ট = ৪ × ৩ = ১২।
  • বিষয় ৩ (ক্রেডিট ২): পেয়েছে A- (৩.৫০)। পয়েন্ট = ২ × ৩.৫ = ৭।

এখন রহিমের মোট অর্জিত পয়েন্ট = ১৬ + ১২ + ৭ = ৩৫।
রহিমের মোট ক্রেডিট = ৪ + ৪ + ২ = ১০।

সুতরাং, রহিমের জিপিএ = ৩৫ ÷ ১০ = ৩.৫০।
দেখেছেন তো? অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম আসলে কতটা সহজ!

অনার্স ১ম বর্ষ থেকে ৪র্থ বর্ষ পর্যন্ত সিজিপিএ হিসাবের পার্থক্য

প্রতি বর্ষের হিসাব আলাদাভাবে বের করা হলেও, ফাইনাল সিজিপিএ বা Cumulative GPA বের করার সময় সব বর্ষের ফলাফল যোগ হয়। অনার্স ১ম বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম এবং অনার্স ২য় বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম হুবহু একই। প্রতি বর্ষ শেষে আপনি একটি জিপিএ পাবেন।

যখন আপনি অনার্স ৩য় বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম প্রয়োগ করবেন, তখনও পদ্ধতি একই থাকবে। কিন্তু ফাইনাল ইয়ার শেষে, মানে অনার্স ৪র্থ বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম মেনে রেজাল্ট পাওয়ার পর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ৪ বছরের মোট অর্জিত পয়েন্টকে ৪ বছরের মোট ক্রেডিট দিয়ে ভাগ করে চূড়ান্ত সিজিপিএ ঘোষণা করে। অর্থাৎ, অনার্স ফাইনাল ইয়ারের সিজিপিএ বের করার নিয়ম আসলে ৪ বছরের গড় ফলাফলের সমষ্টি।

অনার্স সিজিপিএ বের করার সময় শিক্ষার্থীদের সাধারণ ভুল

শিক্ষার্থীরা প্রায়ই কিছু সাধারণ ভুল করে যা তাদের হিসাবে গরমিল পাকিয়ে দেয়। যেমন:

  • অনেকে ক্রেডিটের কথা ভুলে যান এবং সরাসরি বিষয় সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে দেন। এটা করলে আপনার হিসাব ভুল হবে।
  • F গ্রেড পাওয়া সাবজেক্টের ক্রেডিট মোট ক্রেডিটের সাথে যোগ হবে, কিন্তু পয়েন্ট হবে ০। অনেকে এই ক্রেডিট বাদ দিয়ে হিসাব করেন।
  • ৪র্থ বর্ষের হিসাব করার সময় অনেকে আগের ৩ বছরের পয়েন্ট গড় করতে ভুলে যান।

সঠিক ফলাফল পেতে অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম এর প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সাথে অনুসরণ করুন।

ভালো সিজিপিএ পাওয়ার জন্য অনার্স শিক্ষার্থীদের করণীয়

হিসাব তো শিখলেন, কিন্তু ভালো সিজিপিএ পাবেন কীভাবে? এর জন্য কিছু টেকনিক আছে। যেহেতু ৪ ক্রেডিটের সাবজেক্টগুলো ফলাফলে বেশি প্রভাব ফেলে, তাই এই বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ জোর দিন। ২ ক্রেডিটের বিষয়ে এ প্লাস মিস হলে যতটা ক্ষতি হবে, ৪ ক্রেডিটের বিষয়ে বি গ্রেড পেলে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। তাই স্মার্ট স্টাডি প্ল্যান করুন এবং নিয়মিত ক্লাস ও অ্যাসাইনমেন্টে মনোযোগী হোন।

উপসংহার: অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম সংক্ষেপে

আশা করি, এতক্ষণের আলোচনায় আপনাদের কাছে **অনার্স সিজিপিএ বের করার নিয়ম** একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন আর রেজাল্ট শিট হাতে নিয়ে ক্যালকুলেটর খুঁজতে হবে না বা বন্ধুদের কাছে ধর্না দিতে হবে না। মনে রাখবেন, সিজিপিএ শুধুমাত্র একটি সংখ্যা নয়, এটি আপনার ৪ বছরের পরিশ্রমের ফসল।

আপনারা যারা **অনার্স ২য় বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম** বা **অনার্স ৩য় বর্ষের সিজিপিএ বের করার নিয়ম** খুঁজছিলেন, তারাও এই একই পদ্ধতিতে নিজেদের অবস্থান যাচাই করতে পারবেন। আর **অনার্স সিজিপিএ রেজাল্ট কিভাবে দেখব** তা নিয়ে চিন্তা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন। পড়াশোনায় মন দিন, সঠিক নিয়মে হিসাব রাখুন, সাফল্য আপনার হাতেই ধরা দেবে!

ইসাবেলা ক্লার্ক একজন কনটেন্ট রাইটার ও ব্লগার, বর্তমানে বার্মিংহামে বসবাস করছেন। তিনি শিক্ষা, তথ্যভিত্তিক ও ডিজিটাল বিষয় নিয়ে সহজ, পরিষ্কার ও পাঠকবান্ধব লেখা তৈরি করেন। জটিল বিষয়কে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করা এবং পাঠকের কাজে লাগে এমন মানসম্মত কনটেন্ট দেওয়াই তার প্রধান লক্ষ্য।

Leave a Comment