মুসলিম জীবনের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে নামাজ অন্যতম। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের মধ্যে এশার নামাজ বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। দিনের শেষ এই নামাজটি আদায়ের মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা তার সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে উপনীত হন। অনেক সময় এশার নামাজের সঠিক নিয়ম-কানুন নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বিশেষ করে নামাজের নিয়ত, রাকাত সংখ্যা এবং সময় নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে। আজকের আলোচনায় আমরা এশার নামাজের বিস্তারিত নিয়ম, আরবিতে নিয়তের উচ্চারণ, বাংলা অর্থ এবং সময়সূচী সম্পর্কে সহজভাবে জানার চেষ্টা করব।
এশার নামাজ কত রাকাত?
এশার নামাজ মোট ১৭ রাকাত। এই ১৭ রাকাতের মধ্যে রয়েছে সুন্নত, ফরজ, নফল এবং বেতর নামাজ। আসুন নিচে ধাপে ধাপে জেনে নেই এশার নামাজের রাকাত গুলো সম্পর্কে।
১. প্রথমে চার রাকাত সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা।
২. এরপর চার রাকাত ফরজ নামাজ।
৩. তারপর দুই রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
৪. পরে দুই রাকাত নফল নামাজ।
৫. অতঃপর তিন রাকাত বেতর ওয়াজিব নামাজ।
৬. সর্বশেষে আরও দুই রাকাত নফল নামাজ।
এভাবে মোট ১৭ রাকাত পড়ার মাধ্যমেই এশার নামাজ সম্পন্ন হয়। অনেকের ধারণা বেতর নামাজ তিন রাকাত পড়লেই হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি এশার নামাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আরও পড়ুনঃ আদিবাসী কাকে বলে ও কত প্রকার
এশার নামাজের নিয়ত আরবি এবং বাংলা সহ
নামাজের শুরুতে নিয়ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিয়ত মানে ইচ্ছা বা সংকল্প। এশার প্রথম চার রাকাত সুন্নত নামাজের নিয়ত আরবিতে, বাংলা উচ্চারণ এবং অর্থসহ নিচে দেওয়া হলো।
আরবি উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা আরবাআ রাকাআতি ছালাতিল ইশাই সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তায়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলা অর্থ: আমি এশার চার রাকাত সুন্নত নামাজ আল্লাহ তায়ালার জন্য আদায় করার ইচ্ছা করছাম, কিবলামুখী হয়ে। আল্লাহু আকবার।
এশার চার রাকাত ফরজ নামাজের নিয়ত
ফরজ নামাজের নিয়ত সুন্নতের মতোই, তবে এখানে ফরজের কথা উল্লেখ করতে হয়।
আরবি উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা আরবাআ রাকাআতি ছালাতিল ইশাই ফারদুল্লাহি তায়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
(বিঃ দ্রঃ আপনি যদি ইমামের পিছনে পড়েন, তবে ‘ফারদুল্লাহি তায়ালা’ বলার পর ‘ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমাম’ বলবেন।)
বাংলা অর্থ: আমি এশার চার রাকাত ফরজ নামাজ আল্লাহ তায়ালার জন্য আদায় করার ইচ্ছা করছাম, কিবলামুখী হয়ে। আল্লাহু আকবার।
এশার দুই রাকাত সুন্নত নামাজের নিয়ত
ফরজ নামাজের পর যে দুই রাকাত সুন্নত পড়া হয়, তার নিয়ত নিচে উল্লেখ করা হলো।
আরবি উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা রাকআতাই ছালাতিল ইশাই সুন্নাতু রাসূলিল্লাহি তায়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলা অর্থ: আমি এশার দুই রাকাত সুন্নত নামাজ আল্লাহ তায়ালার জন্য আদায় করার ইচ্ছা করছাম, কিবলামুখী হয়ে। আল্লাহু আকবার।
এশার দুই রাকাত নফল নামাজের নিয়ত
নফল নামাজ পড়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যায়। এশার সুন্নতের পর দুই রাকাত নফল পড়ার নিয়ত হলো-
আরবি উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা রাকআতাই ছালাতিল নফলি মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলা অর্থ: আমি এশার দুই রাকাত নফল নামাজ আল্লাহ তায়ালার জন্য আদায় করার ইচ্ছা করছাম, কিবলামুখী হয়ে। আল্লাহু আকবার।
এশার তিন রাকাত বেতর নামাজের নিয়ত
বেতর নামাজ এশার নামাজের শেষ অংশ। এটি ওয়াজিব নামাজ। তিন রাকাত এই নামাজের নিয়ত নিচে দেওয়া হলো।
আরবি উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা সালাছা রাকাআতি ছালাতিল বিতরি ওয়াজিবুল্লাহি তায়ালা মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
বাংলা অর্থ: আমি এশার তিন রাকাত বেতর ওয়াজিব নামাজ আল্লাহ তায়ালার জন্য আদায় করার ইচ্ছা করছাম, কিবলামুখী হয়ে। আল্লাহু আকবার।
বেতর নামাজের পর শেষে আরও দুই রাকাত নফল পড়ার মাধ্যমে এশার নামাজ সম্পন্ন হয়। এই শেষের দুই রাকাত নফলের নিয়ত আগের নফলের নিয়তের মতোই হবে।
এশার নামাজের সময়সূচী
এশার নামাজের সময় শুরু হয় পশ্চিম আকাশে লালিমা বা গোধূলি দূরীভূত হওয়ার পর থেকে। এই সময় সাধারণত সূর্যাস্তের প্রায় ১ ঘন্টা ১৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট পরে শুরু হয়। এশার নামাজের শেষ সময় হলো সুবহে সাদিক বা প্রকৃত ভোর হওয়ার আগ পর্যন্ত। তবে এশার নামাজ রাতের প্রথম ভাগে পড়া সবচেয়ে উত্তম। প্রয়োজনে রাত ১২টার আগে আগে পড়ে নেওয়া উচিত।
কখনো কখনো ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে এশার নামাজ দেরিতে পড়তে হয়। তবে নামাজের সময় পার হয়ে গেলে কাজা নামাজ পড়ার নিয়ম রয়েছে। মনে রাখবেন, যে নামাজের ওয়াক্ত পার হয়ে গেছে, সেটি কাজা পড়ার সময় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ, যদি মাগরিবের নামাজ পড়ার আগে এশার সময় চলে যায়, তাহলে প্রথমে মাগরিবের কাজা নামাজ এবং পরে এশার নামাজ পড়তে হবে। সময়মতো নামাজ পড়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই চেষ্টা করা উচিত ওয়াক্তের শুরুতেই নামাজ আদায় করে নেওয়ার।
এশার নামাজের তাসবিহ
প্রত্যেক নামাজের শেষে তাসবিহ পাঠ করা সুন্নত। এশার নামাজ শেষে কিছু বিশেষ তাসবিহ পড়ার কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। অনেক আলেম মনে করেন, এশার নামাজের পর ১০০ বার “হুয়াল লাতিফুল খাবীর” পড়া বিশেষ ফজিলতপূর্ণ।
উচ্চারণ: হুয়াল লাতিফুল খাবীর।
অর্থ: তিনি পাক এবং অতিশয় সতর্ক দ্রষ্টা।
এছাড়াও সাধারণ তাসবিহ হিসেবে “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ” এবং “আল্লাহু আকবার” পড়া যায়।
এশার নামাজ মুমিনের জন্য রহমত ও বরকতের বার্তা নিয়ে আসে। নিয়তের ভাষা নিয়ে জটিলতা না করে বরং মনে মনে দৃঢ় সংকল্প করাই আসল। উপরোক্ত নিয়ত ও নিয়ম অনুসরণ করে আমরা সহজেই এশার নামাজ আদায় করতে পারি। নিয়মিত নামাজ পড়ার মাধ্যমে নিজের জীবনকে সুন্দর ও শান্তিময় করে তোলা সম্ভব।
আরও পড়ুনঃসমাজ কাকে বলে




1 thought on “এশার নামাজের নিয়ত আরবি এবং বাংলা সহ”