বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল তাদের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। যারা চিকিৎসা সেবাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান এবং একজন দক্ষ নার্স হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চান, তাদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। নার্সিং ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ২০২৬ অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিএসসি এবং ডিপ্লোমা কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
আপনি যদি এই পেশায় আসতে আগ্রহী হন, তবে ৩১ জানুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে আপনাকে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আবেদনের যোগ্যতা, পরীক্ষার মানবন্টন এবং গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনার প্রস্তুতির পথে কোনো বাধা না থাকে।
নার্সিং ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ২০২৬ এর বিস্তারিত তথ্য
নার্সিং পেশা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম সম্মানজনক এবং চাহিদাসম্পন্ন পেশা। বাংলাদেশ নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল বা BNMC এর অধীনে এবারও তিনটি প্রধান কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। কোর্সগুলো হলো চার বছর মেয়াদি বিএসসি ইন নার্সিং, তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি।
সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধার ভিত্তিতে স্বল্প খরচে পড়ার সুযোগ থাকে, যা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় সুযোগ। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নির্দিষ্ট আসনের ভিত্তিতে ভর্তির সুযোগ রয়েছে। এবারের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনলাইনের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের তদারকিতে এই ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, তাই স্বচ্ছতা এবং নিয়মানুবর্তিতা এখানে অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে পালন করা হয়। যারা নার্সিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের জন্য এই সার্কুলারের প্রতিটি নিয়ম খুঁটিয়ে পড়া জরুরি। আবেদনের পিডিএফ নোটিশ।
আবেদনের যোগ্যতা ও শর্তাবলী
নার্সিংয়ে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং শর্ত পূরণ করতে হয়। Nursing Admission Circular 2026 অনুযায়ী, ভিন্ন ভিন্ন কোর্সের জন্য ভিন্ন ভিন্ন যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
সাধারণ শর্তাবলী: প্রথমেই মনে রাখতে হবে, আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। বিদেশি কোনো শিক্ষার্থী সাধারণ কোটায় আবেদন করতে পারবেন না। শিক্ষাবর্ষের বিষয়টিতে বিশেষ নজর দিতে হবে। আবেদনকারীকে এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ২০২৩, ২০২৪ অথবা ২০২৫ সালে উত্তীর্ণ হতে হবে। আর এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় ২০২১, ২০২২ অথবা ২০২৩ সালে উত্তীর্ণ হতে হবে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, এসএসসি এবং এইচএসসি—এই দুই পরীক্ষার পাসের সালের মধ্যে ব্যবধান কোনোভাবেই তিন বছরের বেশি হওয়া যাবে না।
বিএসসি ইন নার্সিং (BSc in Nursing): এই কোর্সটি চার বছর মেয়াদি এবং এটি মূলত বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য। আবেদনকারীকে এসএসসি এবং এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ হতে হবে। আবেদনের জন্য দুটি পরীক্ষায় মোট জিপিএ (GPA) ন্যূনতম ৬.৫০ থাকতে হবে। তবে কোনো একক পরীক্ষায় জিপিএ ৩.০০-এর কম হলে আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। এর বাইরেও একটি বিশেষ শর্ত রয়েছে, যা হলো এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় জীববিজ্ঞানে (Biology) অবশ্যই জিপিএ ৩.০০ থাকতে হবে। বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানে ভালো দখল না থাকলে এই কোর্সে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি: তিন বছর মেয়াদি এই কোর্সে যেকোনো বিভাগের (বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষা) শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। এক্ষেত্রে এসএসসি ও এইচএসসি মিলে মোট জিপিএ ন্যূনতম ৬.০০ থাকতে হবে। তবে কোনো একটি পরীক্ষায় জিপিএ ২.৫০-এর কম হলে আবেদন করা যাবে না। এই কোর্সে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই আবেদন করতে পারেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছেলেদের জন্য ১৫ শতাংশ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ২০ শতাংশ আসন সংরক্ষিত থাকে।
ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি: এই কোর্সটিও তিন বছর মেয়াদি, তবে এটি শুধুমাত্র নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সংরক্ষিত। যেকোনো বিভাগ থেকে পাস করা নারী শিক্ষার্থীরা এতে আবেদন করতে পারবেন। যোগ্যতার মাপকাঠি ডিপ্লোমা ইন নার্সিংয়ের মতোই—মোট জিপিএ ৬.০০ এবং আলাদাভাবে ন্যূনতম ২.৫০ থাকতে হবে।
নার্সিং ভর্তি পরীক্ষার মানবন্টন ও বিষয়সমূহ
ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করার জন্য মানবন্টন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। বিএসসি এবং ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য আলাদা প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষাটি এমসিকিউ (MCQ) পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে এবং পূর্ণমান থাকবে ১০০ নম্বর। সময় বরাদ্দ থাকবে ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। অর্থাৎ প্রতিটি প্রশ্নের জন্য এক মিনিটেরও কম সময় পাওয়া যাবে, তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিএসসি ইন নার্সিং পরীক্ষার বিষয়: বিএসসি পরীক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে বেশি জোর দিতে হয়। তাদের মানবন্টন নিম্নরূপ:
বাংলা: ১৫ নম্বর
ইংরেজি: ২০ নম্বর
গণিত: ১০ নম্বর
বিজ্ঞান (জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন): ৪০ নম্বর
সাধারণ জ্ঞান ও মানবিক গুণাবলি: ১৫ নম্বর
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বিজ্ঞানে ৪০ নম্বর থাকায়, যারা পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে ভালো প্রস্তুতি নেবেন, তারা এগিয়ে থাকবেন।
ডিপ্লোমা কোর্সের পরীক্ষার বিষয়: ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এবং মিডওয়াইফারি কোর্সের সিলেবাস একই। তাদের মানবন্টন হলো:
বাংলা: ২০ নম্বর
ইংরেজি: ২০ নম্বর
সাধারণ গণিত: ১০ নম্বর
সাধারণ বিজ্ঞান: ৩০ নম্বর
সাধারণ জ্ঞান ও মানবিক গুণাবলি: ২০ নম্বর
ডিপ্লোমা পরীক্ষার্থীদের জন্য সাধারণ বিজ্ঞান এবং বাংলা-ইংরেজি অংশটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভালো নম্বর তুলতে পারলে সরকারি নার্সিং কলেজে ভর্তির সুযোগ সহজ হয়ে যায়।
আবেদন ফি এবং পেমেন্ট পদ্ধতি
অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ করলেই আবেদন চূড়ান্ত হয় না, যতক্ষণ না আপনি নির্ধারিত ফি জমা দিচ্ছেন। Nursing Admission Circular 2026 অনুযায়ী, ফি জমা দেওয়ার শেষ সময় ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। আবেদন ফি টেলিটক প্রিপেইড সিমের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
ফি-এর পরিমাণ কোর্সের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন। বিএসসি ইন নার্সিং কোর্সের জন্য আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০০ টাকা। অন্যদিকে, ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি কোর্সের জন্য ফি ৫০০ টাকা।
ফি জমা দেওয়ার পদ্ধতিটি সাধারণত দুটি এসএমএসের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। প্রথম এসএমএসে আপনার ইউজার আইডি পাঠিয়ে পিন নম্বর সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয় এসএমএসে সেই পিন নম্বর ব্যবহার করে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে নেওয়ার অনুমতি দিতে হবে। মনে রাখবেন, ফোনে পর্যাপ্ত ব্যালেন্স না থাকলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। তাই আবেদনের আগেই রিচার্জ করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
মেধা তালিকা ও শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া
নার্সিং ভর্তিতে শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়াটি বেশ স্বচ্ছ এবং গাণিতিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে হয়। মোট ১৫০ নম্বরের ওপর ভিত্তি করে মেধা তালিকা তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ১০০ নম্বর আসে লিখিত এমসিকিউ পরীক্ষা থেকে এবং বাকি ৫০ নম্বর আসে আপনার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জিপিএ থেকে।
জিপিএ থেকে নম্বর বের করার নিয়মটি জানা থাকলে আপনি নিজের অবস্থান আগে থেকেই ধারণা করতে পারবেন: ১. এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ-কে ৫ দিয়ে গুণ করা হয়। অর্থাৎ, কেউ যদি জিপিএ ৫.০০ পায়, তবে তার নম্বর হবে ৫ × ৫ = ২৫। ২. এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত জিপিএ-কেও ৫ দিয়ে গুণ করা হয়। এখানেও সর্বোচ্চ ২৫ নম্বর পাওয়া সম্ভব।
এই (২৫ + ২৫) = ৫০ নম্বর এবং ভর্তি পরীক্ষার ১০০ নম্বর মিলিয়ে মোট ১৫০ নম্বরের মধ্যে আপনার অর্জিত স্কোরের ভিত্তিতে জাতীয় মেধা তালিকা প্রণয়ন করা হয়। তবে এমসিকিউ পরীক্ষায় পাস করতে হলে আপনাকে অবশ্যই ন্যূনতম ৪০ নম্বর পেতে হবে। ৪০-এর কম পেলে তাকে অকৃতকার্য বলে গণ্য করা হবে এবং তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে মেধা তালিকার পাশাপাশি প্রার্থীর পছন্দের ক্রম (Choice List) দেখা হয়। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, যারা পরীক্ষায় পাস করবেন (৪০ বা তার বেশি পাবেন), তারা তাদের মেরিট পজিশন অনুযায়ী সরাসরি বেসরকারি কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারবেন।
অনলাইনে আবেদনের নিয়ম ও গুরুত্বপূর্ণ তারিখ
আবেদন প্রক্রিয়াটি সঠিক সময়ে সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। সময়ের দিকে খেয়াল না রাখলে অনেক যোগ্য প্রার্থীও ভর্তির সুযোগ হারান। নিচে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো তুলে ধরা হলো, যা আপনার ক্যালেন্ডারে মার্ক করে রাখা উচিত:
অনলাইনে আবেদন শুরু: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ (সোমবার), দুপুর ১২টা থেকে।
আবেদনের শেষ সময়: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ (শনিবার), রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত।
টাকা জমার শেষ সময়: ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (রোববার), রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত।
প্রবেশপত্র ডাউনলোড: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত।
ভর্তি পরীক্ষা: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (শুক্রবার), সকাল ১০টা থেকে ১১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত।
আবেদন করার সময় ছবি এবং স্বাক্ষরের সঠিক মাপ (Size) সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। ভুল তথ্য দিলে বা অস্পষ্ট ছবি আপলোড করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া কোটা যেমন মুক্তিযোদ্ধা কোটা বা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর কোটার সুবিধা নিতে চাইলে, আবেদনের সময়ই তা উল্লেখ করতে হবে।
নার্সিং শুধুমাত্র একটি চাকরি নয়, এটি মানবতার সেবার একটি মহৎ মাধ্যম। আপনি যদি Nursing Admission Circular 2026 এর অধীনে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, তবে আর দেরি করবেন না। ৩১ জানুয়ারির জন্য অপেক্ষা না করে দ্রুত আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করুন। সঠিক পরিকল্পনা, পাঠ্যবইয়ের ওপর ভালো দখল এবং বিগত বছরের প্রশ্নগুলো অনুশীলন করলে আপনিও আপনার স্বপ্নের নার্সিং কলেজে পড়ার সুযোগ পেতে পারেন। আপনার মেধা ও পরিশ্রমই আপনাকে একজন সফল সেবিকা বা নার্স হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

1 thought on “নার্সিং ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ২০২৬ আবেদনের শেষ ৩১ জানুয়ারি”