স্বদেশপ্রেম মানুষের এক মহৎ গুণ ও সহজাত প্রবৃত্তি। এই আর্টিকেলে জানুন স্বদেশপ্রেম রচনা, এর গুরুত্ব, ছাত্রজীবনে এর প্রভাব এবং দেশ গঠনে নাগরিকের ভূমিকা সম্পর্কে। দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ।
ভূমিকা
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সে যে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে, যার আলো-বাতাসে লালিত-পালিত হয়, সেটাই তার স্বদেশ বা জন্মভূমি। জন্মভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নাড়ির। এটি কোনো কৃত্রিম সম্পর্ক নয়, বরং এটি হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক পবিত্র অনুভূতি। মা যেমন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, স্নেহ-মমতা দিয়ে বড় করে তোলেন, তেমনি দেশমাতৃকাও তার অবারিত সম্পদ দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। জন্মস্থানের প্রতিটি ধুলিকণা, প্রতিটি ঘাস, নদীর কলতান—সবকিছুর সঙ্গেই আমাদের এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একজন মানুষের কাছে তার জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও বেশি গরীয়সী। তাইতো কবিরা যুগে যুগে গেয়েছেন দেশের গান, আর স্বদেশপ্রেমিকরা দেশের তরে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেদের প্রাণ। এই পবিত্র অনুভূতিকেই আমরা এককথায় বলি স্বদেশপ্রেম বা Patriotism। আজ আমরা এই আর্টিকেলে স্বদেশপ্রেমের আদ্যপান্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
স্বদেশপ্রেম কী
সহজ কথায়, নিজের দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং দেশের মঙ্গলের জন্য কাজ করার প্রবল ইচ্ছাকেই স্বদেশপ্রেম বলে। এটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি শক্তিশালী আবেগ। স্বদেশপ্রেম মানে শুধু দেশের মানচিত্রকে ভালোবাসা নয়; এটি দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, ভাষা, ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ। যখন কোনো ব্যক্তি নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখে, দেশের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দেশের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করে, তখনই তাকে প্রকৃত দেশপ্রেমিক বলা যায়। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘Patriotism’। এই অনুভূতি মানুষকে স্বার্থপরতা থেকে মুক্তি দেয় এবং তাকে সমষ্টির মঙ্গলের জন্য কাজ করতে শেখায়। দেশমাতৃকার প্রতি এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই হলো স্বদেশপ্রেমের মূল ভিত্তি।
স্বদেশপ্রেমের উৎস ও মনস্তত্ত্ব
স্বদেশপ্রেমের উৎস কোথায়? এটি কি অর্জন করতে হয়, নাকি এটি জন্মগত? গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, স্বদেশপ্রেম মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিটি প্রাণীই তার নিজের আবাসস্থলকে ভালোবাসে। বনের পাখি যেমন তার নীড়কে ভালোবাসে, লোকালয়ের পশু যেমন তার চারণভূমিকে ভালোবাসে, তেমনি মানুষও তার জন্মভূমিকে ভালোবাসে। শৈশব থেকে যে পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠি, যে ভাষায় আমরা কথা বলি, যে সংস্কৃতির সাথে আমরা মিশে থাকি—সেগুলোর প্রতি আমাদের মনে এক ধরনের মায়া তৈরি হয়। এই মায়াই কালক্রমে গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে, মানুষ সব সময় নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়। আর এই পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হলো তার দেশ বা Nationality। তাই নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেই স্বদেশপ্রেমের উৎপত্তি হয়।
আরও পড়ুনঃ দেশভ্রমণ রচনা ২০ পয়েন্ট
স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপ
স্বদেশপ্রেমের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একে অন্যান্য অনুভূতি থেকে আলাদা করে। প্রথমত, এটি নিঃস্বার্থ। একজন দেশপ্রেমিক দেশের জন্য কাজ করার সময় বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা করেন না। দ্বিতীয়ত, এটি আবেগময় কিন্তু অন্ধ নয়। প্রকৃত দেশপ্রেমিক দেশের ভুল ত্রুটিগুলো শুধরে দিয়ে দেশকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে চান। তৃতীয়ত, এটি সর্বজনীন। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই তাকে স্বদেশপ্রেম বলা যায়। স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ অত্যন্ত ব্যাপক। এটি কখনো যুদ্ধের ময়দানে আত্মত্যাগের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, আবার কখনো দেশের নিয়ম-কানুন মেনে চলার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একজন সৈনিক যেমন সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেশ রক্ষা করেন, তেমনি একজন কৃষক রোদে পুড়ে ফসল ফলিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখেন। দুজনের কাজ ভিন্ন হলেও দুজনের মধ্যেই রয়েছে স্বদেশপ্রেমের একই সুর।
স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি ও বহিঃপ্রকাশ
স্বদেশপ্রেম মানুষের হৃদয়ে সুপ্ত অবস্থায় থাকে, কিন্তু বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দেশের স্বাধীনতা যখন বিপন্ন হয়, বহিঃশত্রু যখন আক্রমণ করে, তখন দেশের আপামর জনতা সবকিছু ভুলে দেশ রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখেছি। তখন ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। তবে শুধু যুদ্ধের সময়ই নয়, শান্তির সময়েও স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি ঘটে। যখন আমরা বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের জাতীয় সঙ্গীত শুনি, তখন আমাদের চোখ ভিজে ওঠে। যখন আমাদের দেশের কোনো খেলোয়াড় বিশ্বমঞ্চে জয়লাভ করে, তখন আমরা গর্ববোধ করি। দেশের কোনো অর্জনে আনন্দিত হওয়া এবং দেশের কোনো বিপর্যয়ে ব্যথিত হওয়া—এ সবই স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। একজন সৎ নাগরিক হিসেবে নিয়মিত কর প্রদান করা, আইন মেনে চলা এবং পরিবেশ রক্ষা করাও দেশপ্রেমের আধুনিক বহিঃপ্রকাশ।
ছাত্রজীবনে স্বদেশপ্রেমের গুরুত্ব ও শিক্ষা
ছাত্ররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার। আগামী দিনে তাদের হাত ধরেই দেশ এগিয়ে যাবে। তাই ছাত্রজীবনে স্বদেশপ্রেমের বীজ বপন করা অত্যন্ত জরুরি। ছাত্রজীবন হলো নিজেকে গড়ে তোলার সময়। এই সময়ে যদি তাদের মনে দেশপ্রেমের মহান মন্ত্র গেঁথে দেওয়া যায়, তবে তারা ভবিষ্যতে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। ছাত্রদের দেশপ্রেম শুধু পাঠ্যপুস্তকের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাদের জানতে হবে দেশের সঠিক ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংগ্রাম সম্পর্কে। তাদের বুঝতে হবে যে, শিক্ষা অর্জনের মূল লক্ষ্য শুধু ভালো চাকরি পাওয়া নয়, বরং অর্জিত জ্ঞান দিয়ে দেশের সেবা করা। একজন ছাত্র যখন তার মেধা দিয়ে দেশের কোনো সমস্যার সমাধান করে, তখন সেটাই হয় তার দেশপ্রেম। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, যেমন—বৃক্ষরোপণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, এবং দুর্যোগে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে ছাত্ররা তাদের দেশপ্রেমের চর্চা করতে পারে। আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের নেতা, তাই তাদের চরিত্র গঠনে স্বদেশপ্রেমের ভূমিকা অপরিসীম।
স্বদেশপ্রেমের প্রভাব ও মানবচরিত্র গঠন
মানবচরিত্রের সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকাশে স্বদেশপ্রেম জাদুর মতো কাজ করে। যার মনে দেশপ্রেম আছে, সে কখনো অন্যায় করতে পারে না। সে কখনো দুর্নীতিতে জড়াতে পারে না, কারণ সে জানে তার এই কাজে দেশের ক্ষতি হবে। স্বদেশপ্রেম মানুষকে উদার হতে শেখায়, ক্ষুদ্রতা ও হীনম্মন্যতা পরিহার করতে শেখায়। দেশপ্রেমিক মানুষ সর্বদা অন্যের মঙ্গলের কথা ভাবে। তার মধ্যে পরোপকার, সহমর্মিতা এবং ত্যাগের মনোভাব গড়ে ওঠে। এটি মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে শেখায়। দেশের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে। বস্তুত, একজন মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তর করতে স্বদেশপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই। এটি মানুষকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজের জীবনের চেয়েও দেশকে বেশি ভালোবাসতে শেখে।
স্বদেশপ্রেম বনাম উগ্র জাতীয়তাবাদ
দেশপ্রেম নিঃসন্দেহে একটি মহৎ গুণ, কিন্তু এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে, যাকে বলা হয় উগ্র জাতীয়তাবাদ বা Jingoism। যখন দেশপ্রেমের নামে অন্য দেশকে ঘৃণা করা শুরু হয়, নিজের জাতিকেই একমাত্র শ্রেষ্ঠ মনে করা হয় এবং অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করা হয়, তখন তা আর দেশপ্রেম থাকে না। তা হয়ে ওঠে মানবসভ্যতার জন্য হুমকি। ইতিহাস সাক্ষী, এই উগ্র দেশপ্রেমের কারণে পৃথিবীতে বহু যুদ্ধ হয়েছে। জার্মানির হিটলারের নাৎসি বাহিনী বা ইতালির মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল—সবাই উগ্র জাতীয়তাবাদের অন্ধ মোহে মত্ত ছিল। এর ফল হয়েছিল ভয়াবহ। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশপ্রেম মানে অন্যকে ঘৃণা করা নয়। প্রকৃত দেশপ্রেমিক নিজের দেশকে ভালোবাসবে, কিন্তু অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও সংস্কৃতিকেও শ্রদ্ধা করবে। বিশ্বমৈত্রী ও মানবপ্রেমের সাথে স্বদেশপ্রেমের কোনো বিরোধ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই উগ্র দেশপ্রেমের বিরুদ্ধে ছিলেন এবং তিনি বিশ্বমানবতার জয়গান গেয়েছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বদেশপ্রেম
বাঙালি জাতির ইতিহাস স্বদেশপ্রেমের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। এ দেশের মানুষ যুগে যুগে প্রমাণ করেছে তারা দেশকে কতটা ভালোবাসে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ধাপে বাঙালির দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা হয়েছে। ১৯৫২ সালে যখন আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তখন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার বুকের রক্ত দিয়ে সেই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য এমন আত্মত্যাগ আর কোথাও দেখা যায় না। এরপর ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। এই যে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া, এর পেছনে ছিল একটাই শক্তি—সেটি হলো স্বদেশপ্রেম। আজ আমরা যে স্বাধীন দেশে বাস করছি, তা আমাদের পূর্বপুরুষদের গভীর দেশপ্রেমেরই ফসল। বর্তমান প্রজন্মের উচিত সেই ত্যাগের ইতিহাস জানা এবং সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ গঠনে কাজ করা।
সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে স্বদেশপ্রেমের প্রতিফলন
বাংলা সাহিত্যে স্বদেশপ্রেম একটি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে। আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে দেশপ্রেমের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছেন মানুষের মনে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দেমাতরম’ গান একসময় বিপ্লবীদের মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাদের কবিতা ও গানে দেশপ্রেমের যে বাণী প্রচার করেছেন, তা আজও আমাদের উদ্দীপ্ত করে। রবীন্দ্রনাথের “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, যা শুনলে আজও আমাদের লোম দাঁড়িয়ে যায়। নজরুলের “বল বীর, বল উন্নত মম শির” কবিতাটি আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখায়। জীবনানন্দ দাশের “রূপসী বাংলা” কাব্যে বাংলার প্রকৃতির যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা পড়ার পর দেশের মাটির প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়। সাহিত্য দর্পণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে আমরা আমাদের দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। এটি আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয় এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়।
ধর্মে স্বদেশপ্রেমের স্থান
পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মেই দেশপ্রেমকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে দেশপ্রেমকে ইমানের অঙ্গ বা অংশ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে (Hubbul watan minal iman)। অর্থাৎ, যার মধ্যে দেশপ্রেম নেই, তার ইমান অপূর্ণ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জন্মভূমি মক্কাকে গভীরভবে ভালোবাসতেন। যখন তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করছিলেন, তখন তিনি বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলেন এবং অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছিলেন। এটি দেশপ্রেমের এক মহান দৃষ্টান্ত। অন্যান্য ধর্মেও জন্মভূমিকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে এবং স্বর্গের চেয়েও পবিত্র বলা হয়েছে। সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে, “জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী”। অর্থাৎ, মা এবং জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও বড়। সুতরাং, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও দেশপ্রেম একটি পুণ্যময় কাজ। দেশের মানুষের সেবা করা, দেশের সম্পদ রক্ষা করা এবং দেশের মঙ্গলের জন্য দোয়া করা প্রতিটি ধার্মিক মানুষের কর্তব্য।
বিশ্বজুড়ে স্বদেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বেই দেশপ্রেমিকদের বীরত্বগাথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন, যিনি তার দেশকে স্বাধীন করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। ভিয়েতনামের হো চি মিন, যিনি সাধারণ মানুষের পোশাক পরে জীবন কাটিয়েছেন কিন্তু দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, যিনি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবনের দীর্ঘ সময় জেলে কাটিয়েছেন, তবুও দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে আপোষ করেননি। ভারতের মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই মহান ব্যক্তিদের জীবনী আলোচনা করলে দেখা যায়, তাদের সবার জীবনের ব্রত ছিল একটাই—দেশ ও মানুষের কল্যাণ। তারা ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে দেশের জন্য কষ্ট স্বীকার করেছেন। তাদের এই আত্মত্যাগ যুগে যুগে মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। তারা আমাদের শিখিয়েছেন যে, দেশের জন্য কিছু করার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
দেশপ্রেম ও আধুনিক অর্থনীতি
বর্তমান যুগে যুদ্ধের ময়দানের চেয়ে অর্থনৈতিক ময়দানে দেশপ্রেম দেখানো বেশি জরুরি। গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে আমরা বিদেশি পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। কিন্তু একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত দেশি পণ্য ব্যবহার করা। যখন আমরা নিজের দেশের তৈরি পণ্য কিনি, তখন আমাদের দেশের টাকা দেশেই থাকে, দেশের শিল্প কারখানার বিকাশ ঘটে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হয়। একে বলা হয় অর্থনৈতিক দেশপ্রেম। জাপান বা চীনের দিকে তাকালে আমরা দেখি, তারা তাদের নিজেদের ভাষা ও পণ্যকে কতটা গুরুত্ব দেয়। তাদের উন্নতির মূল চাবিকাঠি হলো এই দেশপ্রেম। আমাদেরও উচিত বিদেশি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ না করে দেশীয় সংস্কৃতি ও পণ্যকে প্রাধান্য দেওয়া। ফ্রিল্যান্সাররা যারা রেমিট্যান্স আনছেন, প্রবাসীরা যারা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন—তারাও আধুনিক অর্থনীতির বীর এবং দেশপ্রেমিক।
দেশপ্রেমের অবক্ষয় ও আমাদের করণীয়
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে আমাদের সমাজে দেশপ্রেমের চরম অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষ দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী হয়ে উঠছে। দেশের সম্পদ লুটে নিজের পকেট ভারি করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে অনেকে। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, এবং বিদেশে টাকা পাচারের মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেমের ঘাটতি রয়েছে। মেধাবীরা দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে (Brain Drain), যা দেশের জন্য অশনিসংকেত। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে। পরিবার থেকে শিশুদের নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং সৎ মানুষদের উৎসাহিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশ যদি না বাঁচে, তবে আমাদের ব্যক্তিগত সাফল্যের কোনো মূল্য নেই।
উপসংহার
স্বদেশপ্রেম মানবজীবনের এক অমূল্য সম্পদ। এটি মানুষকে ক্ষুদ্রতা থেকে মহত্ত্বের পথে নিয়ে যায়। দেশপ্রেম কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি চর্চার বিষয়, এটি বিশ্বাসের বিষয়। একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনের জন্য দেশপ্রেমের কোনো বিকল্প নেই। কবি যেমন বলেছেন, “মিছা মণি-মুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয় প্রেম তার চেয়ে রত্ন নাই আর।” আসুন, আমরা ভেদাভেদ ভুলে, স্বার্থপরতা ত্যাগ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হই। আমাদের মেধা, শ্রম ও সততা দিয়ে দেশকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করি। আমরা যেন প্রতিজ্ঞা করি, দেশের এক ইঞ্চি মাটি বা দেশের কোনো মানুষের ক্ষতি আমরা হতে দেব না। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তুলতে। দেশ আমাদের মা, আর মায়ের সেবা করা সন্তানের পরম ধর্ম।
আরও পড়ুনঃ মাদকাসক্তি ও এর প্রতিকার রচনা 20 পয়েন্ট
