অধ্যবসায় রচনা Class 7 – সহজ ভাষায়

ভূমিকা

মানুষের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম। এই সংগ্রামে যারা জয়ী হন, তারা কোনো জাদুমন্ত্রের জোরে নয় বরং নিজেদের শ্রম এবং একাগ্রতার মাধ্যমে সফল হন। প্রবাদে আছে, কীর্তিমান ব্যক্তির যেমন মৃত্যু নেই, তেমনি তার কর্মের কোনো শেষও নেই। এ পৃথিবীতে মানুষ তার নিজস্ব কীর্তির মহিমায় অমরত্ব লাভ করে। জগতের ইতিহাসে যারা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন অসম্ভব অধ্যবসায়ী। সাফল্য লাভের জন্য বারবার চেষ্টা করা এবং পিছু না হটে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার নামই হলো অধ্যবসায়। যদিও মানুষ মাত্রই ভুল করে, তবুও কোনো কাজের ব্যর্থতার গ্লানি মুছে ফেলে সফলতার দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে মহান প্রচেষ্টা, একাগ্রতা ও নিষ্ঠা কাজ করে, তাকেই আমরা অধ্যবসায় বলতে পারি। জীবনের প্রতিটি ধাপে এই গুণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

অধ্যবসায় কি

জীবনে সাফল্য অর্জনের জন্য একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। অধ্যবসায় বলতে কেবল কঠোর পরিশ্রমকে বোঝায় না, বরং এর পেছনে কাজ করে সঠিক পরিকল্পনা, স্ব-বিশ্বাস, অভ্যাস, ধৈর্য এবং প্রচেষ্টা। কোনো কাজে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে লেগে থাকা এবং সাফল্য লাভের অদম্য আকাঙ্ক্ষাকেই সমষ্টিগতভাবে অধ্যবসায় বলা হয়। আমরা যখন কোনো লক্ষ্য স্থির করি, তখন সেই পথে অনেক বাধা আসতে পারে। সেই বাধাগুলোতে দমে না গিয়ে বারবার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই হলো প্রকৃত অধ্যবসায়।

জীবনে সফল হতে চাইলে একাগ্রতা ও নিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। সফলতার পথের প্রথম এবং অনিবার্য শর্ত হলো এই অধ্যবসায়। এটি ছাড়া ব্যক্তি জীবন কিংবা জাতীয় জীবন—কোনো ক্ষেত্রেই উন্নতি কল্পনা করা যায় না। একমাত্র এই গুণের মাধ্যমেই মানুষ জীবনের চলার পথের সকল বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে সফলতার শীর্ষে আরোহণ করতে সক্ষম হয়। এটি এমন এক শক্তি যা অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে।

মানবজীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা কেন এত বেশি

জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এবং প্রতিটি কাজে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানবজীবনের যেকোনো মহৎ কাজ করতে গেলে পথে বাধা আসবেই। কিন্তু সেই বাধাকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসা কাপুরুষতার লক্ষণ। যাদের মন সংশয়ে ভরা এবং সংকল্পে যারা স্থির থাকতে পারে না, তারা সহজেই সাফল্যকে করায়ত্ত করতে পারে না। রাতের গভীর আঁধার পেরিয়ে যেমন উজ্জ্বল সূর্য উদিত হয়, তেমনি অবিরাম চেষ্টার ফলেই মানুষের ভাগ্যাকাশে উদিত হয় সাফল্যের ধ্রুবতারা।

একটি বিখ্যাত ইংরেজি প্রবাদ রয়েছে— “ব্যর্থতাই সাফল্যের সোপান” বা “Failure is the pillar of success.” তাই জীবনে একবার বা দুবার ব্যর্থ হলে ভেঙে পড়া উচিত নয়। ব্যর্থতায় দমে না গিয়ে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেলে এক সময় জীবনে সাফল্য আসবেই। জগতের বড় বড় শিল্পী, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, সেনানায়ক এবং ধর্মপ্রচারকদের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সবাই ছিলেন চরম অধ্যবসায়ী। অধ্যবসায়ী না হলে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে না। এই সংসারে বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করার শক্তি যার যত বেশি, সাফল্যও তার তত বেশি এবং জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার ক্ষমতাও তার ততোধিক।

অধ্যবসায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

সাফল্য এবং ব্যর্থতা এই দুই নিয়েই মানুষের জীবন। সুতরাং সাফল্য পেতে হলে যে গুণটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো অধ্যবসায়। জীবনে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু তাই বলে সাফল্যের স্বপ্নকে বাদ দিয়ে হাল ছেড়ে বসে থাকলে চলবে না। আমরা জানি দিনের পর যেমন রাত আসে, ঠিক তেমনি আমাদের জীবনেও অনেক ব্যর্থতার পরে সাফল্য আসবে যদি আমরা ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি। এ প্রসঙ্গে কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের সেই বিখ্যাত চরণটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

“পারিব না এ কথাটি বলিও না আর, পারো কি না পারো করো যতন আবার, একবার না পারিলে দেখো শত বার।”

অধ্যবসায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও আশা না ছেড়ে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাওয়া। এর মধ্যে কিছু বিশেষ উপাদান থাকা প্রয়োজন। যেমন—সঠিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ, সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা, নিজের ওপর অগাধ বিশ্বাস, নিয়মিত অভ্যাস, অসীম ধৈর্য, নিরলস প্রচেষ্টা, কাজের প্রতি নিষ্ঠা, পরম আন্তরিকতা এবং সর্বোপরি সাফল্য লাভের এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এই সবকিছুর সমন্বয়েই একজন মানুষ প্রকৃত অধ্যবসায়ী হয়ে ওঠে।

অধ্যবসায়ের গুরুত্ব

সাফল্য কখনো হুট করে একদিনে আসেনা। এর জন্য দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, আদিম মানুষ অধ্যবসায়ের মাধ্যমেই মাটিতে, পানিতে ও আকাশে বৈরী শক্তিকে মোকাবেলা করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সফল হয়েছে। অনাবাদি জমি আবাদ করে ফসল ফলানো, জলাভূমি ভরাট করে নগর পত্তন কিংবা মরুভূমিকে মরূদ্যানে রূপান্তর—সবই মানুষের অধ্যবসায়ের ফসল। আদিম গুহাচারী মানুষ আজ যে মহাশূন্যে পাড়ি জমিয়েছে, তার মূলে রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন কর্মপ্রচেষ্টা।

জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-দর্শন এবং চিকিৎসা-শিল্পকলার প্রতিটি শাখায় মানুষের যে অভাবনীয় অগ্রগতি, তার মূলে রয়েছে নিরন্তর সাধনা ও উদ্যোগ। অধ্যবসায়ের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে স্থপতি ফ্র্যাঙ্ক লয়েড একটি চমৎকার উক্তি করেছেন— “সাফল্যের জন্য তিনটি মূল্য দিতে হবে: ভালোবাসা, কঠোর পরিশ্রম, আর স্বপ্নকে বাস্তব হতে দেখার জন্য ব্যর্থতার পরও কাজ করে যাওয়া।” বিশ্বখ্যাত মোটিভেটর ডেল কার্নেগীও বলেছেন, “ব্যর্থতার ছাই থেকে সাফল্যের প্রাসাদ গড়ো। হতাশা আর ব্যর্থতা হলো সাফল্যের প্রাসাদের দুই মূল ভিত্তি।” সুতরাং জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে হলে আমাদের এই গুণের ওপর গুরুত্ব দিতেই হবে।

ব্যক্তিজীবনে অধ্যবসায়

জীবনের চলার পথে আমাদের নানা ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এই সমস্যাগুলো মোকাবেলার একমাত্র কার্যকর উপায় হলো অধ্যবসায়। একজন অধ্যবসায়ী ব্যক্তির পক্ষেই জীবনসংগ্রামে জয়ী হওয়া সম্ভব। যে ব্যক্তি অধ্যবসায়ী নয়, তার দ্বারা কোনো মহৎ কাজ করা সম্ভব নয়। কবিদের ভাষায়, উদ্যম ছাড়া কারো মনের আশা পূর্ণ হয় না। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার এ বিষয়ে বলেছিলেন, “প্রতিভা বলে কিছু নেই। পরিশ্রম ও সাধনা করে যাও, তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে।”

পরিশ্রম ও অধ্যবসায় মূলত একই সূত্রে গাঁথা। অধ্যবসায়হীন মানুষ অনেকটা পঙ্গুর মতো। জীবনে সাফল্য নিজ হাতে ধরা দেয় না, একে অর্জন করে নিতে হয়। বিশ্বখ্যাত লেখক অস্কার ওয়াইল্ডের মতে, “সাফল্য একটি বিজ্ঞান। সঠিক উপাদান মেশালে তুমি সঠিক ফলাফল পাবে।” অর্থাৎ সঠিক পরিশ্রম ও চেষ্টার সংমিশ্রণ ঘটলে সাফল্য নিশ্চিতভাবে আসবেই।

অর্থনীতি

একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করে সেই দেশের মানুষ কতটা পরিশ্রমী তার ওপর। কোনো দেশের অর্থনীতির কাঠামো মজবুত হয় তখনই, যখন সেই দেশের সাধারণ নাগরিকরা কর্মঠ ও অধ্যবসায়ী হয়। বিশ্বের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, অনুন্নত দেশের মানুষের তুলনায় উন্নত দেশের মানুষ অনেক বেশি পরিশ্রমী। উন্নত বিশ্বে যা কিছু আজ অর্জিত হয়েছে, তার প্রতিটি সাফল্যের পিছনে অধ্যবসায় একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে।

দেশের মানুষ যদি অলস হয়, তবে সেই দেশের অর্থনীতি কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের জন্য নিরলস শ্রম ও চেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। তাই একটি জাতির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে অধ্যবসায়ের মানসিকতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

ছাত্রজীবনে অধ্যবসায় এর প্রয়োজনীয়তা

ছাত্ররাই হলো একটি দেশের ভবিষ্যৎ এবং জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। জীবনে বড় কিছু হতে হলে ছাত্রজীবনেই অধ্যবসায়ী হওয়ার দীক্ষা নিতে হয়। অলস, কর্মবিমুখ এবং হতাশ ছাত্রছাত্রীরা কখনো উচ্চশিক্ষা কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, একজন অল্প মেধাসম্পন্ন ছাত্রও শুধুমাত্র অধ্যবসায়ের জোরে অনেক মেধাবী ছাত্রকে পেছনে ফেলে সফল হচ্ছে।

কাজেই কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে হতাশ না হয়ে পুনরায় দ্বিগুণ উৎসাহে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা উচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, “কোনো কাজ ধরে যদি উত্তম সে জন, হউক সহস্র বিঘ্ন ছাড়ে না কখন।” ছাত্রদের উচিত তাদের দৈনন্দিন কাজগুলো সময়মতো এবং নিষ্ঠার সাথে পালন করা। ছাত্রজীবনে সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং চেষ্টার মাধ্যমেই ভবিষ্যতের সফল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব।

অধ্যবসায় ও প্রতিভা

অনেকের একটি ভুল ধারণা আছে যে, অসাধারণ প্রতিভা ছাড়া কোনো কঠিন কাজে সফল হওয়া যায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিভা বা মেধা আসলে অতীত অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। অনেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিক মেধার চেয়ে পরিশ্রমকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মহান বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন বলেছিলেন, “আমার আবিষ্কারের কারণ প্রতিভা নয়, বহু বছরের চিন্তাশীলতা ও পরিশ্রমের ফলে দুরূহ তত্ত্বগুলোর রহস্য আমি ধরতে পেরেছি।”

ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারও প্রতিভার চেয়ে সাধনাকে বড় করে দেখেছেন। আসলে প্রতিভাকে যদি সঠিক সময়ে কাজে লাগানো না হয়, তবে সেই প্রতিভা কোনো কাজে আসে না। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যদি অধ্যবসায়ের গুণে পরিশ্রম করে, তবে সে সব বাধা কাটিয়ে উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে, “Perseverance is the root of all success.” অর্থাৎ অধ্যবসায়ই সকল সফলতার মূল।

অধ্যবসায়ের চর্চা ও অভ্যাসের গুরুত্ব

অধ্যবসায় এমন একটি গুণ যা মানুষ জন্মগতভাবে পায় না; এটি অর্জন করে নিতে হয়। সফল উদ্যোক্তা আর্নল্ড গ্লাসগো বলেছিলেন, “সাফল্যের আগুন একা একা জ্বলে না। এটা তোমাকে নিজ হাতে জ্বালাতে হবে।” একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, সে প্রথমেই হাঁটতে পারে না। সে বারবার পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। এই যে বারবার চেষ্টা, এটাই হলো অধ্যবসায়ের হাতেখড়ি।

আমাদের উচিত ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের মধ্যে এই গুণের চর্চা করানো। মাও সে তুং বলেছিলেন, “সন্তানের সাফল্য চাইলে তাকে মাছ খেতে দেয়ার বদলে মাছ ধরতে শেখাও।” অর্থাৎ তাকে পরিশ্রমী হতে শেখাও। জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে হোক না কেন, নিয়মিত চর্চা ও সাধনার মাধ্যমেই কেবল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

মহাপুরুষদের জীবনে অধ্যবসায়ের অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ

পৃথিবীর ইতিহাসে যারা অমর হয়ে আছেন, তাদের প্রত্যেকের জীবন ছিল এক একটি সংগ্রামের মহাকাব্য। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুসের কথা আমরা সবাই জানি। তিনি ছয়বার যুদ্ধে পরাজিত হয়েও আশা ছাড়েননি। শেষে একটি মাকড়সাকে বারবার দেয়াল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করতে দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন এবং সপ্তম বারের চেষ্টায় যুদ্ধে জয়ী হন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, আলেকজান্ডার—এসব বীর যোদ্ধাদের জয়ের পেছনে ছিল দীর্ঘ অধ্যবসায়ের ইতিহাস।

বিজ্ঞানী গ্যালিলিও, মাইকেল ফ্যারাডে, লুই পাস্তুর, মাদাম কুরি, নিউটন এবং আইনস্টাইনের মতো মনীষীরা নিজেদের জীবনের অনেকটা সময় গবেষণাগারে কাটিয়েছেন কোনো প্রকার বিরতি ছাড়াই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা শেক্সপীয়র তাদের সাহিত্য সাধনার পেছনেও ছিল অদম্য চেষ্টা। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স) তার ইসলাম প্রচারের জীবনে অমানুষিক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যা অধ্যবসায়ের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট গর্বভরে বলতেন, “Impossible is a Word, Which is Only Found in The Dictionary of Fools.

অধ্যবসায়হীনতার কুফল

জীবন কোনো সহজ পথ নয়। ইংরেজিতে বলা হয়, ‘Life is not a bed of roses’। আমাদের সুখের স্বর্গ রচনা করতে হয় কণ্টকাকীর্ণ পথ পার হয়ে। অধ্যবসায়ের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় জীবন মাঝপথে থমকে যায়। একজন মানুষ যতই প্রতিভাধর হোক না কেন, যদি তার মধ্যে ধৈর্যের অভাব থাকে, তবে সে সফল হতে পারে না।

অধ্যবসায়হীন ব্যক্তি জগতের কোনো মহৎ কাজই শেষ করতে পারে না। তার জীবন ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায় এবং একসময় সে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। এ্যাপল কম্পিউটারের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস বলেছিলেন, “রাতারাতি সাফল্য বলতে কিছু নেই। মনোযোগ দিলে দেখবে সব সাফল্যই অনেক সময় নিয়ে আসে।” সুতরাং সাফল্যের জন্য ধৈর্য ধরা শিখতে হবে। অসত্যের পথে সফল হওয়ার চেয়ে সত্যের পথে থেকে কষ্ট করাও অনেক সম্মানের।

সফলতার চিরন্তন সম্পর্ক

আমাদের এই পৃথিবী ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু মানুষের কর্ম অমর। মৃত্যুর মাধ্যমে দেহের বিনাশ ঘটলেও মানুষের মহৎ কাজগুলো বেঁচে থাকে যুগের পর যুগ। যে ব্যক্তি বারবার ব্যর্থ হয়েও অধ্যবসায়ের সাথে সামনের দিকে এগিয়ে যায়, সাফল্য তার জন্য সুনিশ্চিত। অবিচলিত নিষ্ঠার মাধ্যমে সফলতার চূড়ায় পৌঁছানো কোনো অসম্ভব কাজ নয়।

অধ্যবসায়কে জীবনের অলঙ্কার বা কণ্ঠের হার হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এর মাধ্যমেই মানবজীবনে সোনালি অধ্যায়ের সূচনা করা সম্ভব। যারা শ্রমকে ভয় পায় না এবং বিফলতাকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করতে পারে, জয় তাদেরই হয়।

অধ্যবসায়ের শিক্ষা

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের উন্নতির মূলে রয়েছে একটি ধারাবাহিক কর্মস্পৃহা। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, “জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরব কখনো না পড়ে যাওয়ার মধ্যে নয়, বরং প্রতিবার পড়ার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর মধ্যে।” জীবন অনেকটা চলন্ত নদীর মতো, এখানে থেমে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ব্যর্থতা দেখে পিছু হটলে জীবন সেখানেই থমকে যাবে। মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, “জীবনে সফল হতে চাইলে দুটি জিনিস প্রয়োজন: জেদ আর আত্মবিশ্বাস।” অধ্যবসায়ের মূল শিক্ষাই হলো বারবার ব্যর্থ হয়েও সাফল্যের স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করা।

বাঙালি জাতির বর্তমান প্রেক্ষাপট

বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে অধ্যবসায়ের অভাব অনেক সময় পরিলক্ষিত হয়। আমাদের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিশ্রম করার মানসিকতার অভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। সাফল্য লাভের অদম্য ইচ্ছা এবং একটানা কাজ করার ধৈর্য আমাদের মধ্যে গড়ে তোলা প্রয়োজন। ডেল কার্নেগীর মতে, যার মাঝে সীমাহীন উৎসাহ ও বুদ্ধি থাকে এবং যে একটানা কাজ করতে পারে, তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাই আমাদের অলসতা ত্যাগ করে কর্মমুখী হতে হবে।

জাতীয় জীবনে অধ্যবসায়ের সুদূরপ্রসারী প্রভাব

ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে রাষ্ট্র গঠিত হয়। তাই জাতীয় উন্নতির জন্য সমষ্টিগত অধ্যবসায় একান্ত প্রয়োজন। যে জাতি অলস ও উদ্যমহীন, প্রতিযোগিতামূলক এই পৃথিবীতে তারা টিকে থাকতে পারে না। সম্পদ কম থাকা সত্ত্বেও জাপান, জার্মানি বা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো কেবল তাদের কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের গুণে আজ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। একটি জাতির উন্নতি মানেই সেই জাতির প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল।

উপসংহার

মানুষের জীবন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষ স্মরণীয় হয়ে ওঠে তার কাজের মাধ্যমে। যারা সংকল্পে অটল এবং পরিশ্রমী, তাদের কাছে অসাধ্য বলে কিছু নেই। অধ্যবসায়ের কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করতে পারলেই জীবনে সাফল্যের সুবাস পাওয়া যায়। ইতিহাসের পাতায় যারা স্বর্ণাক্ষরে নাম লিখিয়েছেন, তারা সবাই এই গুণের অধিকারী ছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের সেই অমর বাণী দিয়ে শেষ করা যায়— “একটি লক্ষ্য ঠিক করো। সেই লক্ষ্যকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে ফেলো। চিন্তা করো, স্বপ্ন দেখো। তোমার মস্তিষ্ক, পেশী, রক্তনালী – পুরো শরীরে সেই লক্ষ্যকে ছড়িয়ে দাও, আর বাকি সবকিছু ভুলে যাও। এটাই সাফল্যের পথ।”

Bikrom Das

আমি বিক্রম দাস একজন প্রফেশনাল রাইটার। আমি প্রযুক্তি, মোবাইল, ইনকাম তথ্য সম্পর্কিত লেখালেখি করে থাকি। আশাকরি আমার লেখা ভ্যালুয়েবল আর্টিকেল পড়ে আপনারা উপকৃত হচ্ছেন।

1 thought on “অধ্যবসায় রচনা Class 7 – সহজ ভাষায়”

Leave a Comment