শিক্ষাজীবনে নানাবিধ কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যারা ১০ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত, তাদের জন্য এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে (২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে) ১০ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশ করেছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।

বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তন বা ছাড়পত্র (TC) গ্রহণের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। যারা এখনো আবেদন করতে পারেননি বা বিশেষ কোনো কারণে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে দেরি হয়েছে, তাদের জন্য এটি একটি শেষ সুযোগ। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব সময় বৃদ্ধির বিস্তারিত তথ্য, আবেদনের নিয়মাবলী এবং এই প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে।
১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তনের নতুন সময়সীমা
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা খান স্বাক্ষরিত একটি জরুরি নোটিশে এই সময়সীমা বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) প্রকাশিত এই নোটিশে জানানো হয় যে, শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে অনলাইনে টিসি (Transfer Certificate) বা ছাড়পত্র আবেদনের সময় বাড়ানো হয়েছে।
নোটিশ অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ১০ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত যেসকল শিক্ষার্থী বিদ্যালয় পরিবর্তন করতে ইচ্ছুক, তারা আগামী ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন। এর আগে আবেদনের যে সময়সীমা ছিল, তা শিক্ষার্থীদের অনুরোধ এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ পুনর্বিবেচনা করেছে।
এই সময়সীমা বৃদ্ধির ফলে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটিই সম্ভবত শেষ সুযোগ। তাই যারা ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তন নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, তাদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
সময় বৃদ্ধির কারণ ও বোর্ডের নির্দেশনা
শিক্ষা বোর্ড কেন হুট করে সময় বাড়াল? এর পেছনে মূল কারণ হলো, অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আবেদন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সবসময় শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সচেষ্ট।
বোর্ডের নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:
স্মারক ইস্যুর তারিখ হতে ২৮/০১/২০২৬ তারিখ পর্যন্ত এই সময়সীমা বলবৎ থাকবে।
এই বর্ধিত সময়ের পর আর কোনোভাবেই আবেদনের সুযোগ দেওয়া হবে না।
ম্যানুয়াল বা সরাসরি কোনো আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করতে হবে।
অনলাইনে ছাড়পত্র বা টিসি (TC) আবেদনের নিয়মাবলী
বিদ্যালয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যতটা সহজ, এর দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনেকের কাছে ততটাই জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তন বা টিসি নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ করা হয়েছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ঘরে বসেই আপনি এই আবেদন করতে পারেন।
নিচে আবেদনের ধাপগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
আবেদন করতে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি
আবেদন শুরু করার আগে আপনার কাছে নিচের তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখা ভালো:
১. শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ও রোল নম্বর।
২. বর্তমান প্রতিষ্ঠানের নাম ও EIIN নম্বর।
৩. কাঙ্ক্ষিত (যেখানে ভর্তি হতে চান) প্রতিষ্ঠানের নাম ও EIIN নম্বর।
৪. অভিভাবকের মোবাইল নম্বর।
৫. অনলাইনে ফি পরিশোধের ব্যবস্থা (বিকাশ/নগদ/সোনালী সেবা)।
ধাপে ধাপে ই-টিসি (e-TC) আবেদন প্রক্রিয়া
সঠিক নিয়ম মেনে আবেদন করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ওয়েবসাইটে প্রবেশ: প্রথমে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (dhakaeducationboard.gov.bd) ভিজিট করুন।
e-TC অপশন নির্বাচন: হোমপেজের মেনু থেকে ‘e-TC’ (ই-টিসি) বাটনে ক্লিক করুন।
ফরম পূরণ: টিসি আবেদন ফর্মে গিয়ে ‘Transfer Certificate Class 10’ অপশনটি সিলেক্ট করুন। এরপর শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন নম্বর, রোল ও সেশন দিয়ে ‘Enter’ দিন। শিক্ষার্থীর তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে।
নতুন বিদ্যালয় নির্বাচন: আপনি যে বিদ্যালয়ে যেতে চান, সেই বিদ্যালয়ের সঠিক EIIN নম্বর দিন।
ফি পরিশোধ: ফরম পূরণ শেষে সোনালী সেবা বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি জমা দিন।
কনফার্মেশন: ফি জমা দেওয়ার পর একটি স্লিপ বা কনফার্মেশন মেসেজ পাবেন, যা ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আবেদন সাবমিট করার পর বর্তমান বিদ্যালয় এবং ভর্তিচ্ছু বিদ্যালয়—উভয় প্রতিষ্ঠানকেই অনলাইনে অনুমোদন দিতে হবে। তাই আবেদন করেই বসে থাকবেন না, উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করবেন।
বিদ্যালয় পরিবর্তন সংক্রান্ত জরুরি সতর্কতা
১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ ভুল প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়, যা পরবর্তীতে রেজিস্ট্রেশন কার্ড বা প্রবেশপত্র উত্তোলনের সময় বড় সমস্যার সৃষ্টি করে। যেহেতু ২৮ জানুয়ারির পর আর কোনো সুযোগ নেই, তাই নিচের বিষয়গুলো খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে হবে।
যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
ভুল EIIN নম্বর: অনেক সময় তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা ভুল কলেজের বা স্কুলের কোড দিয়ে ফেলে। আবেদন সাবমিট করার আগে দুবার যাচাই করে নিন।
ফি পেমেন্টে সমস্যা: পেমেন্ট করার পর ট্রানজেকশন আইডি (TrxID) সংরক্ষণ না করা একটি বড় ভুল। সার্ভার জটিলতায় পেমেন্ট আটকে গেলে এই আইডিটি প্রয়োজন হয়।
দেরিতে যোগাযোগ: অনলাইনে আবেদন করেই দায়িত্ব শেষ মনে করবেন না। আপনার বর্তমান স্কুল যদি অনলাইনে টিসি রিলিজ না করে, তবে আপনি নতুন স্কুলে ভর্তি হতে পারবেন না।
নিচে নোটিশের সারসংক্ষেপ একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বিবরণ |
| নোটিশ প্রকাশের তারিখ | ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ |
| আবেদনের শেষ তারিখ | ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ |
| শিক্ষাবর্ষ | ২০২৪-২০২৫ (১০ম শ্রেণি) |
| আবেদনের মাধ্যম | শুধুমাত্র অনলাইন (ঢাকা বোর্ড ওয়েবসাইট) |
| কর্তৃপক্ষ | মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা |
শিক্ষাজীবনে বিদ্যালয় পরিবর্তনের প্রভাব
১০ম শ্রেণি একজন শিক্ষার্থীর জন্য টার্নিং পয়েন্ট। সামনেই এসএসসি পরীক্ষা। এই সময়ে বিদ্যালয় পরিবর্তন করলে পড়াশোনায় কিছুটা সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। নতুন পরিবেশ, নতুন শিক্ষক এবং নতুন সহপাঠীদের সাথে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক।
তবে যদি পরিবর্তনটি অপরিহার্য হয় (যেমন: অভিভাবকের বদলি বা বর্তমান স্কুলের পড়াশোনার মানের সমস্যা), তবে দেরি না করাই ভালো। ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি এখন যেহেতু সময়সাপেক্ষ নয়, তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। নতুন স্কুলে গিয়ে সিলেবাসের কতটুকু শেষ হয়েছে এবং প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের অবস্থা কী, তা দ্রুত জেনে নিতে হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এই সময় বৃদ্ধি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আশীর্বাদস্বরূপ। যারা এখনো ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় পরিবর্তন বা ছাড়পত্র সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন, তাদের হাতে আর মাত্র কয়েকদিন সময় আছে। আগামী ২৮ জানুয়ারির মধ্যে সকল কার্যক্রম সম্পন্ন করে নিশ্চিন্তে পড়াশোনায় মন দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
মনে রাখবেন, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। সামান্য অবহেলার কারণে যেন আপনার শিক্ষাবর্ষ নষ্ট না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। আপনার পরিচিত কোনো বন্ধু বা সহপাঠী যদি এই সমস্যায় থাকে, তবে তাদের সাথে এই তথ্যটি শেয়ার করুন।
