লোকসাহিত্যের জগৎ বিচিত্র এবং বিশাল। একটি ছড়া বা গান যখন মুখে মুখে বদলাতে থাকে, তখন তার নতুন রূপ তৈরি হয়। এই নতুন রূপকেই বলা হয় পাঠান্তর। অনেক সময় আমরা একই ছড়ার একাধিক সংস্করণ দেখতে পাই। এদের মধ্যে কোনটি আদি, আর কোনটি পরবর্তী তা বোঝা জরুরি হয়ে পড়ে। সহজ ভাষায়, পাঠান্তর কাকে বলে, তা জানলে সাহিত্য বিশ্লেষণ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
পাঠান্তর কাকে বলে
পাঠান্তর হলো মূল পাঠের বাইরে পাওয়া যাওয়া অন্য একটি পাঠ। এটি আসল লেখা বা ছড়ার বিবর্তিত রূপ। একজন সম্পাদক যখন কোনো গ্রন্থ বা ছড়া সংকলন করেন, তখন তিনি মূলপাঠ নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন পাঠান্তর পরীক্ষা করেন। মূল কথা হলো, আগের একটি ছড়া পরের ছড়ার প্রভাবে কীভাবে বদলে যায়, সেটাই পাঠান্তরের আলোচ্য বিষয়। একে এক ধরনের সংশ্লেষণ বা মেলবন্ধনও বলা চলে।
পাঠান্তর কাকেলে, তা বোঝার জন্য একটি জনপ্রিয় ছড়ার উদাহরণ নেওয়া যাক। ‘আগডুম বাগডুম’ ছড়াটি আমাদের সবার জানা। কিন্তু এই ছড়াটি বিভিন্ন সংগ্রাহকের হাতে বিভিন্ন রূপ পেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, লালারায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আশুতোষ ভট্টাচার্যের সংগৃহীত পাঠগুলোতে পার্থক্য দেখা যায়।
প্রথম চরণটি দেখুন:
কোথাও লেখা আছে, “আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে”।
আবার কোথাও আছে, “আগডম বাগডম ঘোড়াডম সাজে”।
আবার অন্য একটি পাঠে দেখা যায়, “আগডোম বাগডোম ঘোড়ার ডিম সাজে”।
একইভাবে দ্বিতীয় চরণের পাঠও ভিন্ন:
কোনো সংগ্রহে আছে, “ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে”।
আরেকটিতে লেখা, “চাই মিরগেল ঘাঘর বাজে”।
তৃতীয় একটি পাঠে রয়েছে, “লাল সেরা ঘাগর বাজে”।
এই ভিন্নতা দেখেই বোঝা যায়, একটি মাত্র ছড়া কীভাবে অঞ্চলভেদে বা সংগ্রাহকের পছন্দভেদে পরিবর্তিত হয়।
লোকসাহিত্য সংগ্রহকারীর কাছে যখন একই কাহিনি বা ছড়ার একাধিক সংস্করণ আসে, তখন তিনি কিছু নিয়ম মেনে চলেন। উপভাষার প্রভাবই এর প্রধান কারণ। গ্রামের মানুষ নিজের অঞ্চলের ভাষায় ছড়াটি বলেছেন। ফলে শব্দের উচ্চারণ বদলে গেছে। কখনো কখনো কোনো শব্দ বা চরণ প্রক্ষিপ্ত (অপ্রাসঙ্গিক) হয়ে পড়ে। আবার কোনো অংশ শুনতে ভালো বলে সংযোজিত হয়। এভাবেই নানা কারণে পাঠভেদ ঘটে।
সম্পাদকের করণীয় কী?
একাধিক পাঠান্তরের মধ্যে সঠিক মূলপাঠ নির্ধারণ করা সম্পাদকের প্রধান কাজ। এই কাজটি করতে গেলে তাকে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।
প্রথমত, কোনো অংশ যদি প্রক্ষিপ্ত মনে হয়, অর্থাৎ মূল ছড়ার সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক না থাকে, তাহলে সেটি বাদ দিতে হবে। সম্পাদককে সতর্ক থাকতে হবে যেন মূল ভাবনার ক্ষতি না হয়।
দ্বিতীয়ত, চরণ বা অংশের মধ্যে সাধারণতা খুঁজে বের করা জরুরি। যেসব অংশ সবগুলো পাঠেই প্রায় একই রকম, সেগুলোকে মূল বলে ধরে নেওয়া যায়। এটি পাঠান্তর নির্ধারণের একটি কার্যকরী উপায়।
তৃতীয়ত, সংগ্রাহকের ব্যক্তিগত বিবেচনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। যাকে তিনি মূলপাঠ বলে মনে করেছেন, সেটিকে আলাদা করে রেখে বিশ্লেষণ করতে হবে। তারপর অন্যান্য পাঠান্তরের সঙ্গে মিলিয়ে চূড়ান্ত পাঠ নির্ধারণ করতে হবে। এটি সাহিত্য সংকলনের একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ পদ্ধতি।
লোকসাহিত্যের এই জটিল প্রক্রিয়া আমাদের শেখায় যে, কোনো কিছুই একেবারে স্থির নয়। সময়, ভাষা, অঞ্চল এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুই পাঠকে নতুন আকার দেয়। তাই পাঠান্তর কাকে বলে, তা জানা থাকলে আমরা সাহিত্যের গভীরে যেতে পারি। সম্পাদকের কাজটা তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনিই এই ভিন্ন ভিন্ন সূত্রকে এক করে মূল রূপটি আমাদের সামনে তুলে ধরেন।










